ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার জনপদ ঠাকুরগাঁও

ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার জনপদ ঠাকুরগাঁও

ঠাকুরগাঁও একটি প্রাচীন ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জনপদ। এখানে যেমন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ হাজার বছর ধরে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে, তেমনিভাবে বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান শাসনামলের পরিবর্তনের ছোঁয়ায় পালাবদলের প্রক্রিয়া চলছে এখানে। জেলার অতি প্রাচীন পুকুরগুলি এবং গড়গুলির অস্তিত্ব সুপ্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন তুলে ধরে। 

ঠাকুরগাঁও জেলা বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। এই জেলার উত্তরে পঞ্চগড় জেলা, দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, পূর্বে পঞ্চগড় এবং দিনাজপুর জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য অবস্থিত। ঠাকুরগাঁও সদর, পীরগঞ্জ, বালিয়াডাঙ্গি, রানীশংকাইল ও হরিপুর – এই পাঁচটি উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত জেলাটি রাজধানী ঢাকা থেকে ৪৫৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

আয়তন১৮০৯.৫২ কি.মি., জনসংখ্যা- ১৪,৬৬,৮৭৭ জন। জনগোষ্ঠি: মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠি: মুন্ডা, বোডো, সাঁওতাল, ওড়াও, কোচ, পলিয়া, রাজবংশী, হো, মাহাতো, মালো, কুমার, হাড়ি, ভুঁইয়া, গাংঘু। গ্রামের সংখ্যা- ১১০৬, মৌজার সংখ্যা- ৬৪৭, ইউনিয়ন -৫৩টি, পৌরসভা- ৩টি, উপজেলা- ৫টি, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর। 

ঠাকুর পরিবারের বা এ এলাকায় ব্রাহ্মণদের সংখ্যাধিক্যের কারণে ঠাকুরগাঁও নামকরণ হয়েছে। ১৮০০ সালে ঠাকুরগাঁও থানা স্থাপিত হওয়ার পর ১৮৬০ সালে সদর, বালিয়াডাঙ্গী, পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, হরিপুর ও আটোয়ারী নিয়ে ঠাকুরগাঁও মহকুমার যাত্রা। পরবর্তীতে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার পঞ্চগড়, বোদা, দেবীগঞ্জ ও তেতুলিয়া এ চারটি থানা ঠাকুরগাঁও মহকুমার সাথে সংযুক্ত হয়। ১৯৮১ সালে আটোয়ারী সহ উক্ত ৪টি থানা নিয়ে পঞ্চগড় মহকুমা সৃষ্টি হলে ঠাকুরগাঁও মহকুমার সীমানা বর্তমান ৫টি উপজেলার মধ্যে সংকুচিত হয়। ১৯৮৪ সালে ১ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

লোক সংস্কৃতি ধামের গান, ভাওয়াইয়া, পালাগান, পল্লীগীতি, কবিগান, বিচারগান, কোয়ালী গান, বিষহরি গান, সত্যপীরের গান, কীর্তন, বিয়ের গান ও আদিবাসীদের গান। জলাশয় প্রধান নদী: টাংগন, নাগর, কুলিক, তিরনাই, পাথরাই; কাচনা বিল উল্লেখযোগ্য। লোকসংস্কৃতি জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, কবি গান, সত্যপীরের পালা গান, চড়ক পূজা, রাসযাত্রা, প্রবাদ প্রবচন, ধাঁধাঁ, ছড়া উল্লেখযোগ্য।

 

দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা

  • জগদল জমিদার বাড়ি – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • টংকনাথ রাজার বাড়ি – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • সাগুনী শালবন – পীরগঞ্জ উপজেলা;
  • থুমনিয়া শালবন – পীরগঞ্জ উপজেলা;
  • জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ – শিবগঞ্জহাট;
  • বালিয়াডাঙ্গী সূর্য্যপূরী আমগাছ – প্রায় ২০০ বছরের পুরনো, হরিণ মারি গ্রামে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা;
  • ফান সিটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক – পীরগঞ্জ;
  • রাজভিটা – হাটপাড়া, জাবরহাট ইউনিয়ন, পীরগঞ্জ উপজেলা;
  • হরিপুর রাজবাড়ি – হরিপুর উপজেলা;
  • প্রাচীন রাজধানীর চিহ্ন – নেকমরদ, রানীশংকৈল উপজেলা;
  • শেখ নাসির-উদ-দীন নেকমরদের মাজার – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • মহেশপুর মহালবাড়ি ও বিশবাঁশ মাজার ও মসজিদস্থল – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • শালবাড়ি ইমামবাড়া – ভাউলারহাট, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা;
  • সনগাঁ মসজিদ – বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা;
  • ফতেহপুর মসজিদ – বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা;
  • মেদিনী সাগর মসজিদ – হরিপুর উপজেলা;
  • গেদুড়া মসজিদ – হরিপুর উপজেলা;
  • গোরক্ষনাথ মন্দির এবং কূপ – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • হরিণমারী শিব মন্দির – বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা;
  • গোবিন্দনগর মন্দির – ঠাকুরগাঁও শহর;
  • ঢোলরহাট মন্দির – ঠাকুরগাঁও শহর;
  • ভেমটিয়া শিবমন্দির – পীরগঞ্জ পৌরসভা;
  • মালদুয়ার দুর্গ – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • গড়গ্রাম দুর্গ – রানীশংকৈল উপজেলার;
  • বাংলা গড় – রানীশংকৈল উপজেলা;
  • গড় ভবানীপুর – হরিপুর উপজেলা;
  • গড়খাঁড়ি – বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা;
  • কোরমখান গড় – ঠাকুরগাঁও শহর;
  • সাপটি বুরুজ – ঠাকুরগাঁও উপজেলা;
  • রামরাই দিঘী ও অন্যান্য দিঘিসমূহ।

 

খাওয়া দাওয়া

‘সিদল ভর্তা’ এখানকার জনপ্রিয় খাবার, যা কয়েক ধরনের শুঁটকির সঙ্গে নানা ধরনের মসলা মিশিয়ে বেটে তৈরি করা হয়। এছাড়াও রয়েছে বিখ্যাত “হাড়িভাঙ্গা” আম, তামাক ও আখ। এখানে সাধারণভাবে দৈনন্দিন খাওয়া-দাওয়ার জন্য স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো হলোঃ পাটশাক ও লাফা শাকের ঝোল, সিদলের ভর্তা, চেং বা শাটি (টাকি) মাছের পোড়া বা সিদ্ধ ভর্তা, কচি কচু পাতার পোড়া বা সিদ্ধ ভর্তা, পেল্কা, কাঁচা আমের তরকারি, কাঁচা কাঁঠালের তরকারি, আমসি বা টমেটোর টক, নতুন ধানের ভাকা পিঠা (ভাপা পিঠা), পাকোয়ান পিঠা, নুনাস বা নুনিয়া পিঠা, চিতুয়া পিঠা, গুড়গুড়িয়া পিঠা, আঁখের নতুন গুড় দিয়ে তৈরি খৈয়ের মুড়কি, মুড়ির নাড়ু, চিড়ার চিপড়ি।

রাত্রী যাপনের স্থান

ঠাকুরগাঁওয়ে থাকার জন্য স্থানীয় পর্যায়ের কিছু সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে। এছাড়াও থাকার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উন্নতমানের কিছু হোটেলও রয়েছে –

  • সার্কিট হাউজ, ঠাকুরগাঁও;
  • জেলা পরিষদ ডাক বাংলো;
  • হোটেল মানামা, আধুনিক সদর হাসপাতাল এলাকা, ঠাকুরগাঁও;
  • হোটেল ইসলাম প্লাজা;
  • মকবুল হোটেল, পুরাতন বাসষ্ট্যান্ড, ঠাকুরগাঁও;
  • জাহের হোটেল, পুরাতন বাসষ্ট্যান্ড, ঠাকুরগাঁও।

কিভাবে যাবেন?

সড়ক পথে ঢাকা হতে ঠাকুরগাঁওয়ের দূরত্ব ৪৫৯ কিলোমিটার এবং রেলপথে ঢাকা হতে ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনের দূরত্ব ৬৪০ কিলোমিটার।

সড়ক পথে- ঢাকার গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ, শ্যামলী, কল্যানপুর, কলাবাগান, ফকিরাপুল, আসাদগেট – প্রভৃতি বাস স্টেশন থেকে ঠাকুরগাঁও আসার সরাসরি দুরপাল্লার এসি ও নন-এসি বাস সার্ভিস আছে; এগুলোতে সময় লাগে ৭.৩০ হতে ১০ ঘন্টা। ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে হানিফ, নাবিল, বাবলু, কেয়া প্রভৃতি পরিবহণ কোম্পানীর বাস আছে প্রতিদিন।

  • নাবিল পরিবহনঃ ☎ ০২-৮১২৭৯৪৯ (আসাদ গেট);
  • বাবলু এন্টারপ্রাইজঃ ☎ ০২-৮১২০৬৫৩, মোবাইল ০১৭১৬-৯৩২১২২ (শ্যামলী-রিং রোড);
  • হানিফ এন্টারপ্রাইজঃ ☎ ০২-৮১২৪৩৯৯, মোবাইল ০১৬৭৩-৯৫২৩৩৩ (কলেজ গেট), ০১৭১৩-৪০২৬৬১ (কল্যাণপুর), ০১৭১৩-৪০২৬৭১, ০১৭১৩-৪০২৬৩১ (আরামবাগ);
  • শ্যামলী পরিবহনঃ ☎ ০২-৯০০৩৩১, ৮০৩৪২৭৫ (কল্যাণপুর);
  • কেয়া পরিবহনঃ মোবাইল ০১৭১১-১১৮৪০২ (কল্যাণপুর);
  • কর্ণফুলী পরিবহনঃ মোবাইল ০১৬৭৪-৮০৫ ১৬৪ (আবদুল্লাহপুর)।

ভাড়া- এসি বাসে – ৮০০/- (রেগুলার) ও ১২০০/- (এক্সিকিউটিভ) এবংনন-এসি বাসে – ৩৫০/- হতে ৬০০/-।

রেলপথ- ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ট্রেনে সরাসরি এখানে আসা যায়। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে প্রতিদিন একাধিক ট্রেন ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা – ঠাকুরগাঁও রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো হলোঃ পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস এবং একতা এক্সপ্রেস

এছাড়াও, কাঞ্চন এক্সপ্রেস, সেভেনাপ, এবং ডেমো ট্রেনটি চলাচল করে পার্বতীপুর, রংপুর হয়ে।

ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেনঃ

কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন, ☎ ০২-৯৩৫৮৬৩৪,৮৩১৫৮৫৭, ৯৩৩১৮২২, মোবাইল নম্বর: ০১৭১১-৬৯১৬১২;

বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশন, ☎ ০২-৮৯২৪২৩৯;               ওয়েবসাইট: www.railway.gov.bd।

আকাশ পথে- ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর থাকলেও তা চালু না-থাকায় এখানে সরাসরি আকাশ পথে আসা যায় না, তবে ঢাকা থেকে সরাসরি বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের সাথে; ঢাকা থেকে সৈয়দপুর এসে সেখান থেকে সড়কপথে ঠাকুরগাঁও আসা যায়।

কৃতি ব্যক্তিত্ব

  • রাজা গণেশ (শাসনকাল ১৪১৫) ছিলেন বাংলার একজন হিন্দু শাসক। তিনি বাংলার ইলিয়াস শাহি রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় আসেন।
  • সুরবালা সেনগুপ্ত; ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিপ্লবী নেত্রী।
  • রাজা টংকনাথ চৌধুরী, মালদুয়ার পরগণার একজন জমিদার।
  • নরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ; ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
  • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়; বিখ্যাত টেনিদা চরিত্রের স্রষ্টা ভারতীয় বাঙালি লেখক ।
  • স্বদেশরঞ্জন মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের শহীদ বিপ্লবী।
  • তৃপ্তি মিত্র, বাংলা ভাষার থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ভারতীয় অভিনেত্রী এবং শম্ভু মিত্রের স্ত্রী।
  • মোখলেসুর রহমান (জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৩৫) বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ।
  • জনাব মোঃ খাদেমুল ইসলাম, বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার একজন রাজনীতিবিদ
  • রমেশ চন্দ্র সেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী।
  • হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য।
  • মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিব ও সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী।
  • দবিরুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য।
  • শিশির ভট্টাচার্য্য, চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট।
  • মো. ইয়াসিন আলী, বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য।
  • লিটু আনাম (বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেতা।
  • সেলিনা জাহান লিটাহলেন বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!