জলে ভাসা পেয়ারার বাজারঃ বাংলাদেশের ফ্লোটিং মার্কেট

Back to Posts
floating-market-bhimruli

জলে ভাসা পেয়ারার বাজারঃ বাংলাদেশের ফ্লোটিং মার্কেট

ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। একসময় বরিশাল অঞ্চলকে ‘বাংলার ভেনিস’ বলা হতো। এই বরিশাল ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে। আর এই জলে বাসা পেয়ারার ভাসমান বাজার পর্যটকদের কাছে এখন জনপ্রিয়।

এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম পেয়ারা বাগান গড়ে উঠেছে ঝালকাঠি, বরিশাল ও পিরোজপুর-এই তিন জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায়। শুধু বাগানই নয়, পেয়ারার বেশ বড় ভাসমান বাজার রয়েছে এখানে।

ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার ডুমুরিয়া, কাপড়কাঠি, কাঁচাবালিয়া, ভীমরুলি, হিমানন্দকাঠি, শতদশকাঠি, রামপুর, মীরাকাঠি, শাওরাকাঠি, জগদীশপুর, আদমকাঠি এবং পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার আটগড়, কুরিয়ানা, বংকুরাসহ আরও কিছু গ্রামে প্রায় ৩১ হাজার একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। দেশে উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ শতাংশই উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলে।

ছোট ছোট খাল দিয়ে আসছে পেয়ারার নৌকা। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এসব এলাকার পেয়ারা বিক্রির মূল সময়। বিভিন্ন খালে খালে বসে এসব ভাসমান বাজার। এর মধ্যে অন্যতম আটগড়-কুড়িয়ানা বাজার ও ভিমরুলী হাট। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট্ট নৌকায় পেয়ারা নিয়ে আসেন চাষিরা। সেখান থেকে পেয়ারা কিনে নেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারেরা। এই হাটে প্রতিদিন তিন হাজার মণের মতো পেয়ারা বিক্রি হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।

ভাসমান বাজারে গিয়ে দেখা গেল, খালগুলোতে একসঙ্গে অনেক নৌকা আর নৌকাভর্তি পেয়ারা। এ দৃশ্য দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। বর্ষার পানিতে টইটম্বুর খাল, খালের পাড়ে সবুজ প্রকৃতি আর নৌকায় সবুজ-হলুদ পেয়ারা। ছোট্ট নৌকা কিংবা ট্রলারে দুই পাশে পেয়ারা বাগানের মাঝখান দিয়ে খালে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যটাও বেশ উপভোগ্য।

floating-market-bhimruli

ভিমরুলি হাট:

ভিমরুলি হাট খালের একটি মোহনায় বসে। তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিশেছে এখানে। অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত এ মোহনায় ফলচাষিরা নৌকা বোঝাই ফল নিয়ে ক্রেতা খুঁজে বেড়ান। তবে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সারা বছরই বসে ভাসমান হাট। তবে পেয়ারার মৌসুমে হয় জমজমাট বাজার। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। ভিমরুলির আশপাশের সব গ্রামেই ভরপুর পেয়ারা বাগান। এসব বাগান থেকে চাষিরা নৌকায় করে সরাসরি এই বাজারে পেয়ারা নিয়ে আসেনভিমরুলি ভাসমান বাজারের উত্তর প্রান্তে খালের উপরের ছোট একটি সেতু আছে। সেখান থেকে বাজারটি খুব ভালো করে দেখা যায়। আকর্ষণীয় দিক হল এখানে আসা সব নৌকাগুলোর আকার আর ডিজাইন দেখতে প্রায় একইরকম। মনে হয় যেন একই কারিগরের তৈরি সব নৌকা।

ভিমরুলির বাজারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হল দুপর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা। এ সময়ে নৌকার সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে যায়। ঝালকাঠী জেলা সদর থেকে ইজিবাইকে করে এই হাটে আসতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। চাইলে নৌকায়ও আসা যায়, সেই ক্ষেত্রে সময় লাগবে এক ঘণ্টা। সর্বোত্তম হলো নদী পথেই আসা। কারন নদীর দুই পাশের সময় মনোরোম প্রকৃতি দেখতে দেখতে সময়টা ভালই কাটে।

 

আটঘর–কুড়িয়ানা:

গ্রামের নাম আটঘর-কুড়িয়ানা। আবার এই নামে ইউনিয়নও। পেয়ারার জন্য দেশব্যাপী এর খ্যাতি। এজন্য গ্রামের নাম ছাপিয়ে পেয়ারার গ্রাম বলে পরিচিত। পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠী থানা সদর থেকে ৮ কি.মি. পূর্ব দিকে এই গ্রামের অবস্থান। মাইলের পর মাইল চোখে  পড়বে কেবল পেয়ারার বাগান। কবে থেকে এই এলাকায় পেয়ারার চাষ শুরু হয়েছিল তা নিয়ে কয়েকটি ভিন্নমত প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলে প্রায় দুই শ’ বছর আগে তীর্থ করতে এখানের কোন একজন ভারতের  বিহার রাজ্যের গয়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে এই ফল দেখে চাষ সম্পর্কে অবগত হয়ে বীজ এনে বপন করেছিলেন আটঘর- কুড়িয়ানাতে। স্থানীয়রা অনেকেই এই ফল কে গইয়া নামে ডাকেন। এখানকার বাসিন্দাদের আয়ের একমাত্র উৎস এই গইয়া বা পেয়ারা। শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে পেয়ারার মৌসুমে এই গ্রামের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মত। দূর দূরান্ত এলাকা থেকে পাইকার আসে। বরিশাল ছাপিয়ে ফরিদপুর হয়ে রাজধানীসহ দেশের অনান্য অঞ্চলেও পৌঁছে যায় এখানকার পেয়ারা।

মিষ্টি প্রেমিরা কুড়িয়ানা গেলে সেখানকার বাজার না ঘুরে চলে আসবেন না। অবশ্যই নরেন বিশ্বাসের ঋতুপর্ণা মিষ্টান্নভাণ্ডারে এক বারের জন্যে হলেও ঢুঁ দেবেন। কারন কুড়িয়ানা বাজারের সুস্বাদু রসমঞ্জুরি ও মালাইের বিশেষ খ্যাতি আছে। আর বাজারে বৌদির হোটেলে খেতে পারেন দুপুরের খাবার। ভাসমান পেয়ারা বাজার থেকে বরিশাল আসার পথে গুটিয়া ও দুর্গাসাগর দিঘী ঘুরে আসতে পারেন।

থাকার ব্যবস্থা

যদিও এই ট্যুরে থাকার প্রয়োজন হয় না চাইলে সারা দিন ঘুরে রাতে লঞ্চ ধরে ফিরে আসা যায়। তারপরও থাকতে চাইলে জেলা শহরের সাধারণ/মাঝারি মানের হোটেলই একমাত্র ভরসা। ঝালকাঠি শহরে কয়েকটি হোটেল আছে। কালিবাড়ি রোডে ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউস, বাতাসা পট্টিতে আরাফাত বোর্ডিং, সদর রোডে হালিমা বোর্ডিং ইত্যাদি। ভাড়া ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। ভালো মানের হোটেলে থাকতে হলে বরিশাল চলে আসতে হবে।

যেভাবে যাবেন

একরাত ও দুই দিন সময় হাতে পেলেই ঘুরে আসা যায় স্বরূপকাঠির ভাসমান বাজার। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় হুলারহাটের উদ্দেশে ২-৩টি লঞ্চ ছেড়ে যায়। এর যেকোনও একটিতে চড়ে পরদিন সকাল ৬টার দিকে স্বরূপকাঠি নেমে যাবেন। ভাড়া ডেক ১৮০ টাকা, কেবিন ১ হাজার টাকা (সিঙ্গেল) ও ১ হাজার ৮০০ টাকা (ডাবল)। এছাড়া ঢাকার গাবতলী থেকে স্বরূপকাঠির উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। এতে উঠে স্বরূপকাঠি যেতে ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। চাইলে বরিশাল হয়েও যেতে পারেন। রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে অনেক লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। লঞ্চে বা বাসে বরিশাল গিয়ে আবার বাসে বা অটোতে করে স্বরূপকাঠি যেতে হবে।

স্বরূপকাঠি পৌঁছানো যাবে ভোর ৬টার মধ্যে। স্বরূপকাঠি বাজারের পাশেই পাবেন নৌকার ঘাট। ঘাটে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ৭-৮ ঘণ্টার জন্য ভাড়া করা যায়। তবে ভাড়া করার সময় বলে নেওয়া ভালো কোন কোন জায়গায় ঘুরবেন। ১০-১৫ জন বসার মতো একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার ভাড়া দেড় হাজার থেকে ২ হাজার টাকার মতো।
সকালে ভিমরুলির বাজারে পৌঁছে প্রসিদ্ধ ভাসমান বৌদির হোটেলে নাস্তা খেয়ে নিতে পারেন। আগে অর্ডার করলে ভালো খাবার রান্না করে রাখবে। দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে সেখানে।

floating-market-bhimruli

বাসে গেলে

সদরঘাট, গাবতলী থেকে বেশ কয়েকটা বাস বরিশাল যায়। এদের মধ্যে সাকুরা পরিবহন ভালো। ভাড়া ৪০০-৬০০ টাকার মধ্যে।

স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাটের সরাসরি বাসও রয়েছে। গাবতলী থেকে সোনার তরী, সাকুরা, হানিফ বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ৫০০ টাকা।

বরিশাল বা স্বরূপকাঠি যেখানেই আসেন সেখান থেকে কুড়িয়ানা যাওয়ার উপায় উপরেই দেওয়া আছে। জেনে রাখা ভালো যে, বাসের চেয়ে লঞ্চ জার্নি বেশি আরামদায়ক।

সতর্কতা

জলে বাসা পেয়ারার বাজার বা বাংলাদেশের ফ্লোটিং মার্কেট ভ্রমণে পেয়ারা বাগানের মালিকরা চাইলেই পেয়ারা খেতে দেবে। তাই অযথা গাছের ডাল ভাঙা থেকে বিরত থাকা উচিত। যেহেতু পুরো ভ্রমণটা নদীকেন্দ্রিক, সেহেতু সাঁতার জানা না থাকলে লাইফজ্যাকেট নিয়ে যাবেন। এছাড়া মোবাইল প্রোটেক্ট করতে ওয়াটারপ্রুফ মোবাইল কেস রাখবেন। পর্যাপ্ত কাপড় আনলে ভালো কারন যেহেতু ফ্লোটিং মার্কেট পুরো টা পানিতে,তাই কাপড় ভিজে গেলে বদলে নিতে পারবেন। ভালো গ্রিপ ওয়ালা স্যান্ডাল বা জুতা পরিধান করবেন।  প্রয়োজনীয় ঔষুধ ও এক্সট্রা পলিথিন ব্যাগ নিজ দায়িত্বে আনবেন। মোবাইলে চার্জ ঠিকভাবে রাখার জন্য পাওয়ার ব্যাঙ্ক আনবেন নিজ দায়িত্বে। ছাতা সাথে থাকলে খুব ভালো। পরিবেশ অবশ্যই নোংরা যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন,বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় জিনিস বাইরে ফেলবেন না। যারা লঞ্ছের ডেকে থাকবেন, অবশ্যই চাঁদর আনবেন, রাতে ঘুমানোর জন্যে।

 

‘পরিব্রাজক’ সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।

দৃষ্টি আকর্ষণ: হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই পরিব্রাজক-এ প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ‘পরিব্রাজক’ দায়ী থাকবে না।

 

Share this post

Comment (1)

  • Md. Shahabuddin Mia Reply

    খুব ভালো লাগলো ভ্রমনে অনেক সুন্দর আয়োজনের জন্য।

    August 7, 2019 at 4:00 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!