প্রাচীন দ্বীপ সন্দ্বীপ

Back to Posts

প্রাচীন দ্বীপ সন্দ্বীপ

অত্যন্ত প্রাচীন দ্বীপ খ্যাত সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত উপজেলা। মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত এই দ্বীপটির চতুর্দিকে নদী আর সাগর বেষ্টিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই দ্বীপ ভ্রমণ দারুণ অনুভূতি যোগাবে।

চারদিকে অবারিত সবুজ মাঠ, গাছপালা, নদী সব মিলিয়ে সন্দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। উপরে সুনীল আকাশ আর নিচে সবুজ বিরান ভূমি মুগ্ধকর এক দৃশ্য। এছাড়া দেখতে পাবেন নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। নদীর পাড়ে রাতে ক্যাম্পিং করেও থাকতে পারেন। ক্যাম্পিং এর জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে একেবারে পশ্চিমের রহমতপুর নদী পাড়। ফসল ভরা মাঠ, মনোরম পরিবেশ আর স্নিগ্ধ বাতাসে মন ভালো হয়ে যাবে মুহূর্তেই। এখানকার মানুষ গুলাও অনেক সহজ সরল প্রকৃতির।

সন্দ্বীপে শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠে পাড়া-মহল্লা। জেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে পাখিরাও মাছ শিকার করেন। দল বেঁধে পাখিদের উড়াউড়ি মন কেড়ে নেয়। একসাথে অবলোকন করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।

দর্শনীয় স্থান

দ্বীপের পুরোটা জুড়েই প্রকৃতির স্নেহ ছায়া বিরাজ করছে। সন্দ্বীপের পশ্চিমের পাড়ের পরিবেশ এখানে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এখানে শীতকালে ক্যাম্পিং ও বিকালে সূর্যও ডুবার অপরূপ দৃশ্য দেখতে পারেন। তাছাড়া আরো কিছু দর্শনীয় স্থান ও রয়েছে- 

  • তাজমহল আদলে নির্মিত মরিয়ম বিবি সাহেবানি মসজিদ।
  • কুমিরা স্টিমার ঘাটের আশপাশে আছে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প।
  • স্টিমার ঘাট থেকে আসা যাবার পথে দেখা যায় সীতাকুণ্ড রেঞ্জের পাহাড় গুলো।
  • গুপ্তছড়া ঘাটের প্রাকৃতিক পরিবেশ-ম্যানগ্রোভ বেষ্টনী।
  • ও উত্তরের সবুজ চরে গিয়েও ঘুরে আসতে পারেন।
  • ও দক্ষিণ দিকের ঐতিহ্যবাহী শুকনা দিঘী।

অবস্থান

চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে নৌপথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত সন্দ্বীপ উপজেলার আয়তন মাত্র ৮০ বর্গমাইল। চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত সন্দ্বীপ উপজেলা বর্তমানে ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। জনসংখ্যা ২,৭৮,৬০৫ জন। সন্দ্বীপের সীমানা হচ্ছে পূর্বে সন্দ্বীপ চ্যানেল ও চ্যানেলের পূর্ব পাড়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা ও মীরসরাই উপজেলা; উত্তরে বামনী নদী; পশ্চিমে মেঘনা নদী, নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা, সুবর্ণচর উপজেলা ও হাতিয়া উপজেলা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

সন্দ্বীপ কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে নদী পথে সন্দ্বীপ- সদরঘাট থেকে সপ্তাহে তিন দিন সকাল ৯ টায় লঞ্চ ছেড়ে যায় সন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে । বর্তমান সময়ে এই ভ্রমণে একটু সমস্যা হবে, বিরক্ত বোধ করতে পারেন । তার অন্যতম কারন হল সন্দ্বীপের পশ্চিমে জেগে উঠা চর । যার কারনে উঠা নামাতে দীর্ঘ সময় এবং কষ্ট পোহাতে হবে ।

ঢাকা থেকে সড়ক পথে সন্দ্বীপ- সন্দ্বীপ যেতে সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রামী যেকোন দূরপাল্লার বাসে চড়ে বসুন। নামতে হবে কুমিরা। আপনার বাসকে কুমিরা স্টিমার ঘাট যাবার স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিতে বলুন। সেখান থেকে অটো বা রিক্সায় চলে যান কুমিরা স্টিমার ঘাট। এখান থেকে যেতে হবে জলপথে সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাট। মূল ভূখণ্ড থেকে সন্দ্বীপে যাওয়ার একমাত্র পথ এই জলপথ।

চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে সন্দ্বীপ- চট্টগ্রাম শহরের যে কোন জায়গা থেকে সরাসরি চলে আসতে পারেন কুমিরা । সহজ এবং সময় বাচাতে ট্যাক্সি ভাড়া করতে পারেন। সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ পড়বে ।

কুমিরা ঘাট থেকে সন্দ্বীপ- কুমিরা সন্দ্বীপ ঘাট থেকে সন্দ্বীপ যাওয়ার জন্যে স্পিডবোট ও ছোট লঞ্চ আছে। স্পিডবোট ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা, গুপ্তছড়া ঘাট (সন্দ্বীপ) যেতে সময় লাগবে ৩০ মিনিটের মত। যদি হোটেলে থাকতে চান তবে সন্দ্বীপ ঘাট (গুপ্তছড়া ঘাট) থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন টাউন কমপ্লেক্সে। আর ক্যাম্পিং করার জন্যে যেতে পারেন সন্দ্বীপের পশ্চিম পাড়ে (রহমতপুর) নদী ঘেঁষে। সন্দ্বীপ ঘাটে নেমে সিএনজি (ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা) দিয়ে চলে যেতে যেতে পারবেন রহমতপুর।

লঞ্চ /ট্রলার (কাঠের তৈরি অনেকটা নৌকার মতই) এতে করে কুমিরা ঘাট থেকে যেতে পারেন সন্দ্বীপ। এখানে যাত্রী বহনযোগ্য লঞ্চ আছে , সাথে মাল বোঝায় করে এমন লঞ্চে করে যেতে পারেন । এটাতে সময় বাচবে খরচের পরিমাণ ও কম । উঠা নামায় খানিকটা সমস্যা হবে। এ যাত্রায় আনন্দ আছে তবে অতিরিক্ত যাত্রী , মাল বোঝায় থাকার কারন সেই আনন্দ ফিকে হতে পারে।

কোথায় থাকবেন

সন্দ্বীপের মূল শহর এলাকা এনাম-নাহার মোড়ে রয়েছে ২/১ টি হোটেল। এছাড়াও আরও এগিয়ে সেনেরহাট এলাকায় রয়েছে একটি উন্নত মানের হোটেল। এছাড়া অনুমতি নিয়ে থাকতে পারেন উপজেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে (মাহমুদুর রহমান ০১৮১১৩৪১৭২২)।

সবচেয়ে ভালো হয় এখানে দক্ষিণ পাড়ে তাঁবু করে থাকাটা। খোলা আকাশের নিচে শান্ত স্নিগ্ধ হাওয়া চাপিয়ে নদীর কলকল ধ্বনি এসে মনে জুড়ে বসে। এক্ষেত্রে বাজার থেকে জিনিশ পত্র কিনে এনে খেয়ে নিতে পারেন। সব কিছুই সহজলভ্য। তবে অতিথিপরায়ণের দিক থেকে সন্দ্বীপের আলাদা খ্যাতি রয়েছে।

খাওয়া দাওয়া

সেনেরহাটে, উপজেলা পরিষদের ডাক বাংলোর আশেপাশে মোটামুটি মানের কয়েকটি খাবার হোটেল রয়েছে। আর স্থানীয় খাবারের মধ্যে শিবের হাঁটে গিয়ে মিষ্টি খেয়ে আসতে পারেন। শীতে গেলে খেজুর রস ও নানা রকম পিঠা পাবেন।

ভ্রমণ মৌসুম ও পরিকল্পনা

সন্দ্বীপ ভ্রমণের আদর্শ সময় শীতকাল। বছরের বাকিটা সময় জলপথ বেশ উত্তাল থাকে। সন্দ্বীপে দিনে গিয়ে দিনে ফেরার ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আবার একরাত সন্দ্বীপে থাকার পরিকল্পনাও করা যেতে পারে। দিনে গিয়ে দিনে ফিরতে চাইলে ঢাকা হতে আগের রাতে যথাসম্ভব আগের বাসে উঠতে হবে। সকাল সকাল কুমিরা স্টিমার ঘাট পৌঁছে সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সন্দ্বীপ ভ্রমণ করুন। আবার বিকাল বিকাল মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসুন এবং সীতাকুণ্ড হতে ঢাকার বাস ধরুন। সন্দ্বীপে একদিনের ভ্রমণে অবশ্যই দিনের ভেতর মূল ভূখণ্ডে ফেরত আসুন, শেষ স্পিড বোট ছাড়ার সময়সূচি জেনে তারপর ভ্রমণ করুন।

এছাড়া চট্টগ্রাম বা সীতাকুণ্ড ভ্রমণ করেও সন্দ্বীপকে ভ্রমণের তালিকায় রাখতে পারেন।

নোট* সন্দ্বীপের বিখ্যাত মিষ্টি খেয়ে দেখতে পারেন। তবে এর জন্য আপনাকে দ্বীপের দক্ষিণে শিবের হাট যেতে হবে।* সাইকেল ভাড়া নিয়ে ঘুরতে পারেন আশেপাশে। অল্প সময়ে আরামে কোন একটা এলাকা ঘুরে দেখার জন্যে বেস্ট অপশন।* রিক্সা বা অন্যান্য বাহনের ভাড়া একটু বেশি মনে হতে পারে, দরদাম করে নিবেন।* খেজুরের রস এই সময় পাওয়া গেলে না খাওয়াটা বোকামি হবে। আশেপাশেই খোঁজ করলেই পাবেন। গাছ থেকে সদ্য নামানো রসের মজাই আলাদা।* খেজুরের রসের ফিন্নি/পায়েস যদি সম্ভব হয়ে কোথাও খেয়ে দেখতে পারবেন, স্বাদ ভুলবেন না কখনো নিশ্চিত।* যদি সম্ভব হয় স্থানীয়দের প্রিয় ঘন খেজুরের মিঠাই এর সাথে কোড়ানো নাড়িকেল আর খোলাজা পিঠা খেয়ে আসবেন।

পরামর্শ:

  • সন্দ্বীপে বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। এটা মাথায় রেখেই সন্দ্বীপে অবস্থান করবেন।
  • স্পিড বোটে জলপথে ভ্রমণের সময় অবশ্যই বোটে রাখা লাইফ জ্যাকেট পরিধান করবেন।
  • সাইকেল পেলে ভাড়া নিয়ে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারেন। দারুণ মজা পাবেন।
  • ক্যাম্প করলে রাতে স্থানীয় কাউকে নিয়ে থাকতে পারেন। এটা সুবিধেরও। খরচও অল্প।
  • যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে দ্বীপের সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না। পরিবেশের ক্ষতিও যাতে নাহয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

কৃতী ব্যক্তিত্ব

  • আবদুল হক –– বীর বিক্রম খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা।
  • আবদুল হাকিম –– মধ্যযুগের কবি।
  • বেলাল মোহাম্মদ –– স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান উদ্যোক্তা।
  • বেলায়েত হোসেন –– বীর উত্তম খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা।
  • মহেশচন্দ্র বড়ুয়া –– ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব।
  • মাহফুজুর রহমান মিতা –– রাজনীতিবিদ।
  • মুজফ্‌ফর আহ্‌মেদ –– রাজনীতিবিদ।
  • মুস্তাফিজুর রহমান –– রাজনীতিবিদ।
  • মোহাম্মেদ দিদারুল আলম –– বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা।
  • রোহিণীকুমার কর –– ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব।
  • লালমোহন সেন –– ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব।

 

তথ্য সহযোগিতার প্রয়োজনে যোগাযোগ-সনজয় রায়, উদ্যোক্তা, মাইটভাঙ্গা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, সন্দ্বীপ 01717294352

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!