নামস্তে নেপাল : অর্ণপূর্ণা বেস ক্যাম্প

Back to Posts

নামস্তে নেপাল : অর্ণপূর্ণা বেস ক্যাম্প

লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প, তারপর হাতছানি অল্প
চায় চায় উড়তে উড়তে, মন চায় উড়তে উড়তে।

চোখে ঘুম তখনো লেপ্টে আছে কিন্তু সাদা পাহাড়ের লুকোচুরি খেলা মনের মধ্যে উপরের লাইন দু’টি দোল খাচ্ছিল। এ হঠাৎ-ই এক পাওয়া। অথচ একদিন আগেও শিউর ছিলাম না আসলে আসা হচ্ছে কিনা। তাইতো মাঝে মধ্যে নিজেকে চিমটি দিয়ে দেখছিলাম সত্যিই এখানে তো।

তিন ভবঘুরের উদ্দেশ্যের কুল কিনারা নেই। এই ধরুন-ত্রিভুবন বিমানবন্দর নেমেই নেপাল পর্যটন গেলাম অন্নপূর্না বেসক্যাম্পের অনুমতির জন্য। ফর্ম পূরণ করা অবস্থায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম সার্কিট ট্রেক নাকি বেসক্যাম্প? তিনের এক অর্থাৎ টুটুল ভাই আবার গম্ভীর প্রকৃতির সহজ-সরল ও সিরিয়াস মানুষ, তিনি আমাদের আশ্বস্ত করলেন হবে-শিঘ্রই আবার হবে। ইমরান ভাই-সহমত বলে দিল। আমিও সহমত বলে দিলাম, কারণ ইমরান ভাই-এর অভিধানে নেই শব্দ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বলা রাখা ভালো যে- বেস ক্যাম্পে যাব এ বিষয়ে পূর্বে একমিনিটও ভাবতে পারেনি। তাই ইমরান ভাই হাতে একটি আঁকাবাঁকা ম্যাপ ধরিয়ে বলল- ভ্রমণসঙ্গীকে সাথে রাখুন।

হোটেল আল-মদিনা, সবাই সবার দিকে কানি চোখে তাকিয়ে দেখছে, কারণ এখানে বাঙ্গালীরা ব্যাপক ভিড় জমায়। একজন বলে বসল- ঢাকা থেকে? হেসে উত্তর দিতেই সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করা শুরু। ভোজন রসিক ইমরান ভাই অর্ডার দিল বাফেলু আর গরু সাথে ভাত। আহ পুরোই অমৃত। আল মদিনা হোটেলের বিশেষত্ব হচ্ছে মুসলিম হোটেল সাথে দামও কম।

হোটেল সাঙ্কারা, দেখা হলো পোর্টেবল হার্ডডিস্ক খ্যাত সামসু ভাইয়ের সাথে, তার পরামর্শে আমাদের বস্তার ন্যায় ট্রেকিং ব্যাগগুলো থেকে কাপড় কমিয়ে ট্রেকিং এর উপযুক্ত ব্যাগ বানালাম। আসলে কাধের ব্যাগ ছোট রাখা অনেক কষ্টকর বিষয়। ইতিমধ্যে ডলার কে নেপালি রুপি তে পরিণত করা সহ কাঠমুন্ডু-পোখারা বাসের টিকেট রেডি। বাইরে ট্যাক্সি অপেক্ষায়। বাসস্ট্যান্ডে চেকইন করা মাত্র দালালের দোড়ঝাপ। বিপত্তি ঘটল চা খেতে গিয়ে- এককাপ চায়ের দাম ২০ রুপি? তখনো জানা ছিলনা সামনে এই এককাপ চায়ের দাম ৩০০ রুপীর উপরে হতে পারে!

পোখারা। অন্নপূর্ণা আর মাছাপুছারে পাশেই স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে। আন্দাজ করলাম বাসস্ট্যান্ড এর উল্টো পাশেই। দুরুত্বও বেশি নয়। কিন্তু ভাবতে পারেনি এই দুটোর নিচে যেতে ৫ দিন হাটতে হবে। আহা-বাংলাদেশি ভাই-ব্রাদারদের সাথে দেখা। টিম এলটিটিউড নামের ১০ জনের এই গ্রুপ বেসক্যাম্প থেকেই ফিরছে। টাটকা কিছু টিপস সমেত অভিজ্ঞতা শেয়ার করল। আর হাতে তুলে দিল ঝাঁকড়া লম্বা চুলের এক স্টাইলিস্ট গাইডকে। নাম অন্তিম, প্রফেশনাল ভলিবল প্লেয়ার।

ঘান্দ্রুক বাসস্ট্যান্ড। ব্যাপক দরকষাকষি করে মনোজ গুরুং-এর যাত্রীবাহী জীপে চড়ে বসলাম। সাথে আছে নেপালি এক পরিবার ও জাপানিস কাপল যাদের বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। ইমরান ভাই ‘আরিগাতো’ বলে সম্বোধন করায় অবাক হয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে কথা বিনিময় শুরু। ভাবলাম আশে পাশে কোথাও যাবে। কিন্তু গন্তব্য কোথায় জানতে চাইলে বেসক্যাম্প বলে উঠল। আমাদের চোখ উপরে উঠে গেল। বলল এ নিয়ে চারবার!

দুপুর 1 টা। ঘান্দ্রুক। খুব উঁচু স্থান ও সর্বশেষ বাসস্ট্যান্ড। ইতিমধ্যে বিরথাটিতে ট্রেকিং রুটের কাগজাদি চেক হয়েছে আর অন্তিমের সাথে খোশ গল্প জমে গেছে। অন্তিম জানালো হোটেল সামনেই। মিনিট পাঁচেক হেঁটে গিয়ে ঘান্দ্রুকের সবচেয়ে উঁচু হোটেল হ্যাভেন লজ ভিউ’তে উঠলাম। অন্যান্য ঘরগুলোও ছিল অসাধারণ। দেখতে ছবির মত। রুমে ঢুকে এক সর্গীয় অনুভূতি অনুভব করলাম আর বাহিরে বিশাল খোলা বারান্দা আর সামনে দেখি চকচক করছে মাছাপুছারে আর অন্নপূর্ণা। আহা, এ যেন স্বর্গ।

বিকেল ৪টা। ঘান্দ্রুকের সৌন্দর্য্য অবলোকনে বাড়ীগুলোর আশপাশ হয়ে হ্যালিপ্যাডে পৌছালাম। এখান থেকে পুরো ঘান্দ্রুককে একফ্রেমে দেখা যায়। হঠাৎ-ই বৃষ্টির হানা। এক ফসলা মেঘ আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ে ঘান্দ্রুককে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। বিভিন্ন আলাপের ফাঁকে ইন্টারভিউ দিতে হলো হিন্দি ভাষায়। সন্ধ্যা নেমে আসছে। অন্নপূর্ণা আর মাছাপুছারে পাহাড়দ্বয় আরো চমৎকার রূপ ধারণ করল। একদল বিদেশিদের সাথে আলাপ হল। তাদের মধ্যে একজন ঝিলস্‌। সুইজারল্যান্ড ও ইতালির যৌথ নাগরিক। অভিজ্ঞতা শেয়ার হলো। রাত আবার ছিল পূর্ণিমার। লাখো তারার সাথে এদের জ্বলজ্বল করা রূপ স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করল। গান বাজনা আর রাতের খাবারে বাংলাদেশি চিড়া ভক্ষণ কখনো ভূলার নয়।

সকাল ৬.৩০। টোস্ট ডিম খেয়ে ট্রেকিং শুরু। উদ্দেশ্য চমরং। আগে থেকে জানা বেশ কিছু সিঁড়ি পড়বে তবে সমস্যা হবেনা। কিন্তু এ সিঁড়ি যে কতটা ভয়ংকর ও কখনো শেষ হবেনা তা প্রতি কদমে কদমে টের পেয়েছি। সারা রাস্তায় একটি জিনিস ভেবেছি তা হলো এ জন্যই কি সিঁড়ি-ফরহাদের মিল হয়নি! পাহাড়ে উপরে উঠা ও নিচে নামা দুটোই সমান কষ্টকর ব্যাপার। তবে উপরে উঠতে দম বের হয়ে যাবার উপক্রম হয় আর ক্ষুধায় দূর্বল হয়ে যায় শরীর। হঠাৎ চোখে পড়ল বিশাল এক ঝুলন্ত ব্রিজ আর তার তলদেশে প্রবাহিত বিশাল এক নদী তবে পানি শুকিয়ে ছোট আকৃতির হয়ে গেছে। উপরে কিছু ঘর দেখা যাচ্ছে। পেটের টানে দ্রুত উঠলাম।

আকাশ তলে পাহাড়ের ঘা ঘেঁষে কিমরুখোলা আর তার ঘা ঘেঁষে নদী। সব মিলে সৌন্দর্যে ভরপুর। যদিও দুপুর হয়নি কিন্তু মধ্যাহ্ন ভোজ এখানেই সারলাম। টুটুল ভাই আবার খাবারের আগে পড়ে ৩০ মিনিট ঘুমিয়ে নিল। কারণ ভাইয়ের ঘুম আসতে সময় লাগে ১০ সেকেন্ডের মত। ইমরান ভাই বিভিন্ন ফ্রেমে ঘুম ও নাক ঢাকার চিত্র ধারণ করছিলেন এমন সময় খাবার সামনে দিয়ে গেল। খাবার পর্ব শেষ করে রওয়ানা হলাম চমরং এর উদ্দেশ্যে। শুনলাম ৩ ঘন্টার রাস্তা বাকি। হাটা শুরু, কিন্তু একি! হাজার সিঁড়ি এবার লাখো সিড়িতে রূপ নিল। অল্প একটু উঠেই শুয়ে পড়ি মাটিতে। এক কথায় শুয়ে বসে কাত হয়ে, চিত হয়ে, গল্প, আড্ডা, মন খারাপকে সাথে করে এক পর্যায়ে অনেক উঁচু একটি স্থানে পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে চমরং দেখা যায়। এজন্য আবার নামতে হবে ঘন্টা খানেক। এই রাস্তা সহজেই পাড়ি দেয়া গেল।

বিকেল ৪.৪৫ মিনিট। ১৯.৫ কিলো হেঁটে কাঙ্ক্ষিত চমরং। হোটেল প্যানারোমা পয়েন্ট লজ এন্ড রেস্টুরেন্ট-এ চেকইন করে কোনভাবে অল্প করে ফ্রেশ হয়ে রুমে গিয়ে ল্যাটানি দিলাম। ঘুম ভাংগল গাইডের “খানা রেডি হ্যায়” মৃদু আওয়াজে। ক্যান্টিন রুমে দেখি সবাই কম্বল মুড়িয়ে খাচ্ছে। দ্রুততার সহিত প্রাইড রাইস, স্যুপ খেয়ে নিলাম। রুমে এসে গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝিনি তবে এত জার্নির ভিতরও অসাধারণ এক স্বপ্ন দেখলাম। যা অন্য সময় শেয়ার করা হবে।

সকাল ৬ টা। খোলা বারান্দা থেকে মনে হচ্ছে হাত বাড়িয়ে মাছাপুছারে আর অন্নপূর্ণাকে ছুঁয়ে দেয়া যাবে। আবারো টোস্ট আর ডিম খেয়ে শুরু হল ট্রেকিং। উদ্দেশ্য আজ দোবান-এ রাত্রিযাপন। অন্নপূর্ণা কনজার্ভেশন এরিয়া (এসিসি) চেকপোস্ট থেকে নাম লেখিয়ে সিঁড়ি নামা শুরু। টানা ৩০ মিনিট নামা শেষে এবার উঠা শুরু। দম এখানেই শেষ মনে হলো। যাত্রাপথে বিরতি হলো সিনুয়াতে। এত অল্প সময় হেটেই সিনুয়ায় চলে আসায় ব্যাপক খুশি হলাম। চা-আড্ডা আর গান বাজনা চলল। কোরিয়ান গায়কের গিটারে বাজল ‘কান্ট্রি রোডস, টেইক মি হোম’ কণ্ঠ মিলিয়ে স্বমুস্বরে গাইলাম।

আরো ১ ঘন্টা উপরের দিকে শুয়ে বসে আগালাম। অদূরে কিছু ঘর দেখে খুশি হয়ে ভাবলাম হয়ত পরবর্তী লক্ষ্য ব্যাম্বু চলে এসেছি। হায়- এ দেখি সাইনবোর্ডে লিখা আপার সিনুয়া। তারমানে নিচের টা ছিল লোয়ার সিনুয়া। বিষন্ন মনে আবার হাটা শুরু। কাত-চিত হয়ে উপর-নিচ যেতে যেতে দুপুর গড়িয়েছে। পেটের অবস্থা নাজেহাল। প্ল্যান অনুযায়ি ব্যাম্বুতে লাঞ্চ হবে। কিন্তু কোথায় সে ব্যাম্বু!

দুপুর ২টা। দূরে কিছু ঘর দেখে ছুটে যাই। কাঙ্ক্ষিত সেই ব্যাম্বু। উচ্চতা ২১৪৫ মিটার। ব্যাগ ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে দ্রুত খাবারের মেন্যুতে নজর ইমরান ও টটুল ভাইয়ের। একটা আইটেম বাংলাদেশের মিলে গেল। বিশ মিনিটের মধ্যে হাজির। সামনে দেখি প্লেটে ভাত, ডাল, সবজি, ভর্তা আর ডিমভাজা। আহা, এ যেন অমৃত। পুরোই ব্যুফে খেয়ে ল্যাটানি দিলাম। এক পর্যায়ে ঘুম। টুটুল ভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল, বলল যেতে হবে এবার। ট্রেকিং শুরু, হায় পারছিনা যে, মনে হল কাঁধে একটা ব্যাগ আর পেটে ভাতের একটা ব্যাগ। এই দুই ব্যাগ নিয়ে হাফাতে হাফাতে আগাচ্ছি। এক সময় দেখি দোবান। গাইড বলে আরো মিনিট বিশেক সামনে আমাদের কটেজ। ইতিমধ্যে আজ ১৮+ কিলো হাটা হয়ে গেছে।

নতুন কটেজ, এখনো নাম দেয়া হয়নি। রুম নম্বর ৫ এ চেকইন করে সোলার চালিত ওয়াটার হিটার থেকে দ্রুত গোসল করে নেই। অন্তিম মেন্যু নিয়ে হাজির রাত ও সকালের খাবারের অর্ডার নিতে। সন্ধ্যা নামতেই আড্ডা শুরু এমেরিকান এক সলো ট্রাভেলারের সাথে। ফরেইনার ট্রাভেলারদের অধিকাংশের গল্প হচ্ছে ৬ মাস কাজ করে বাকি ৬ মাস পৃথিবী ভ্রমণে বের হয়ে যায়। এখানে নেপালি একটি কাপলও ছিল। যাদের দেখলে সিনেমার হিরো হিরোইন মনে হয়। গল্প চলতে চলতে খাবার টেবিল থেকে ডাক আসে, আহ। ভাতের প্লেটের সাথে আরকটি পিৎজার আইটেম সাজানো।

সকাল ৭ টা। ট্রেকিং শুরু। মূল দোবান থেকে মিনিট বিশেক এগিয়ে থাকায় ধীরে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত। উদ্দেশ্য আজ হিমালয়া-দিউরালি হয়ে এমবিসিতে রাত্রী যাপন। অন্নপূর্ণা রুটের প্রেমে পড়ে গেছি। চারদিকে জঙ্গল কোথাও কোথাও ঝর্ণা আবার তার পানি রাস্তা বেয়েই নিচে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ চোখে পড়ল হনুমান সাইজ এক বানরের। এই এলাকা পুরোপুরি তাদের দখলে। খুব সতর্কতার সাথে পাড়ি দিতে হল। হিমালয়া পার হয়ে দেউরালি উদ্দেশ্য। দূর থেকে দেখা গেলেও এ পথ যেন শেষ হচ্ছিল না। চারদিকে অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি আর রিস্কি পাহাড় দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে এ বুঝি ভেঙ্গে পড়বে।

দেউরালি। উচ্চতা ৩২০০ মিটার পরিবেশ জানান দিচ্ছে গন্তব্য আর বেশি দূরে না। প্রিয় খাবার ভাত, ডাল, ডিম ও সবজির অর্ডার হলো। ট্রেকাররা কেউ ল্যাটানি, কেউ আড্ডা আর একদল পিয়ানোর পাগল করা সুরে গানের আসর জমিয়েছে। আমি এদলেই। যারা এবিসি মিশন কমপ্লিট করে ফিরছে নামাস্তে নেপাল বলে মিস্টি হাসি দিয়ে আগাচ্ছে। অনেকক্ষণ রেস্ট নিয়ে আবার হাটা শুরু। আকাশের মেঘগুলো ঝরে পড়ার অবস্থা। পাশের বরফের পাহাড়গুলো ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাচ্ছে। স্নোফল হচ্ছে ওদিকটাই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।

বিকেল ৪ টা। সাড়ে ১৪ কিলো হেঁটে স্বপ্নের ও কাঙ্ক্ষিত সেই এমবিসি (মাউন্ট মাছাপুছারে বেসক্যাম্প)। অন্নপূর্ণা আর মাছাপুছারের ঠিক ঘা গেষে এর অবস্থান। বিশ্বাস করা যাবেনা যে কি পরিমাণ সৌন্দর্য্য ভরা এই বেসক্যাম্প। হোটেল ফিসটেইল গেস্টহাউজ এন্ড রেস্টুরেন্ট-এ চেকইন করলাম। সবাই একে একে আসতে শরু করল যাদের সাথে পথিমধ্যে দেখা হয়েছিল। এ যেন এক মিলনমেলা। গান আড্ডায় মসগুল হলাম। আমাদের (ট্যুর সময়কালীন) জাতীয় সঙ্গীত নেপালি গান রেশাম ফিরিরি’ ও ইংরেজি গান ‘কান্ট্রি রোডস’ দীপ্ত কণ্ঠে গাইলাম।

এমবিসিতে শীতের যত কাপড় ছিল সব পড়তে হল। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুরুহ ব্যাপার ছিল। তাপমাত্রা মাইনাস হওয়ায় পরিবেশের সাথে আমাদেরও বরফের ন্যায় জমে যাবার অবস্থা প্রায়। সান্ধ্য নামার আগে সূর্য্যি মামাটা মাছুপুছারের গায়ে লেপ্টে গেল। তখন এক ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য্য ধারণ করল। মনে হল সোনা গায়ে জরিয়ে আছে। সবাই এ মুহুর্তকে বন্দী করার চেস্টায় রত হলো। ডাইনিং রুমটি খুব মজবুত ভাবে তৈরি মনে হলো শীত প্রবেশের সকল রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখানেই রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। বিশাল মেন্যু আজ- ফ্রাইড রাইস, রুটি, ডিম মামলেট, ডিম পোস, কফি, আপেল।

এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল ফাইনালি। কিন্তু অনেকক্ষণ আগ থেকেই অপেক্ষা করছিলাম ৩ টা বাজবার! আর কতক্ষণ! দ্রুত রেডি হয়ে গেলাম। অন্তিম এই প্রথম আমাদের সম্পূর্ণ রেডি অবস্থায় পেল। ইমরান ভাইয়ের মাথায় হেডল্যাম্প, টুটুল ভাইয়ের হাতে টর্চ আর আমার হাতে মোবাইলের আলো। শীতের সকল প্রস্তুতি নিয়ে যখন হাটা শুরু ঘড়িতে তখন বাজে ৪.১০। অন্ধকারে ট্রেকিং এর প্রথম। প্রথমে একটু সমস্যা হলেও দ্রুত ওভারকাম করি। চারদিকে সাদা বরফের আবরণের কারণে অন্ধকারেও প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যাচ্ছিল। আগাতে আগাতে একসময় কিছু আলো দেখা যাচ্ছিল অনেক দূর থেকে। এক সময় কিছু ঘরও দেখা যাচ্ছিল। অথচ চারপাশে তখনো অন্ধকারের আভা সরেনি। দৌড়ে পৌঁছে গেলাম।

৫.৪২ মিনিট। অন্ধাকারে দেখলাম একটি সাইনবোর্ডে লিখা Congratulation! We achieved.

Annapurna Base Camp 4130 meter. আরেকটি বোর্ডে লিখা NAMASTE Annapurna Base Camp. চারদিকে অন্ধকারের আলো সরে আলো ছড়াচ্ছে। একে একে সবাই ঝড়ো হচ্ছে। সবাই সবাইকে বুকে জরিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। ট্রেকারদের অনেকের চোখে হাসির আনন্দের সাথে চোখের কোনে জলও দেখা যাচ্ছিল। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানায় সবাই। বাংলাদেশের পতাকা মাথায় নিয়ে, বুকে জরিয়ে প্রিয় মুহুর্তকে ছবির প্রেমে বন্দী করি।

দানবের ন্যায় চারপাশে অবস্থিত সাদা পর্বত অন্নপূর্না সাউথ, অন্নপূর্না-১, গঙ্গাপূর্ণা, আর উল্টোদিকে মাছাপুছারের গায়ে সুর্য্যের আলো পড়লে একেকটা স্বর্ণের খন্ডের ন্যায় রূপ ধারণ করে। বেসক্যাম্প অংশটায় কয়েকটা কটেজ আছে। কিন্তু এই মাইনাস ৮ তাপমাত্রায় না থাকায় শ্রেয় মনে হয়েছে। নাকের পানি গড়িয়ে নিচে পড়ার আগেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। ইমরান ভাই বাংলাদেশ থেকে একটা কোকের ক্যান নিয়ে গেছে বেসক্যাম্পে খাবে কিন্তু আমাদের কারোই মাথায় ছিলনা সেটি যে বরফ হয়ে যাবে। বরফের মাঝে হারিয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলাম। নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হল। কটেজের ডাইনিং রুমের একটি দেয়ালে বেসক্যাম্পে আসা লোকদের পাসপোর্ট সাইজের লক্ষ্যাধিক ছবি আটকানো। পাশে একটি হ্যালিপ্যাড আছে যাতে পোখারা থেকে অনেকে সরাসরি হ্যালিকপ্টারে আসতে পারে।

বেশিক্ষণ এ জায়গায় থাকলে জমে যেতে হবে তাই ফিরতে হবে। তবে তার আগে অসংখ্য ছবি-ভিডিও বার্তার মুহূর্তের স্মৃতি সাথে নিয়ে ফিরছি। আর সবাইকে বিদায় জানাচ্ছি। কোলকাতার দাদাদের একটি অংশ এখানেই থাকবে। তাদের বিদায় দেয়ার মুহুর্তটা অনেক আবেগঘন ছিল। চারপাশ অবাক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে মাত্র ৪০ মিনিটেই এমবিসিতে পৌঁছে যাই।

সকাল ১০ টা। বিদায় এমবিসি। ব্যাম্বুতে রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু। খানিক আগাতেই সেই ৮০ ছুঁই ছুঁই জাপানিস কাপলের সাথে দেখা। আবারো আবেগি মুহুর্ত। সত্যি এ কয়েকটি দিনে খুব আপন হয়ে গিয়েছিল। আবার যেহেতু নামার পথ বেশি তাই কষ্ট কম হচ্ছিল কিন্তু হাটুতে চাপ পড়ছিল। তাও যেখানে ২ ঘন্টা লাগার কথা সেসব রাস্তা আমরা ১ ঘণ্টাতেই পার হচ্ছিলাম। দেওরালি- হিমালয়া-দোবান হয়ে ব্যাম্বুতে গিয়ে যখন পৌছি তখন সময় ৪.৩০। চাইলে সিনুয়া যাওয়া সম্ভব। তবে ট্রেকিং সহ জীবনের প্রতিটি স্তরের জন্য একটি বাক্য আছে-‘থামতে জানতে হয়, থেমে যেতে হয়’ এ কথা স্মরণ করে ব্যাম্বুতেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত হয়। ইতিমধ্যে কিন্তু ২৯.৫০ কিলোমিটার হাটা হয়ে গেছে।

সবচেয়ে কঠিন রাস্তার মুখোমুখি হব আজ। তাই ব্রেকফাস্ট নিয়ে একটু সকাল সকাল রওয়ানা দেই। যদিও পারব বলে বিশ্বাস সকলের কিন্তু অনেক কষ্টসাধ্য হবে এটিও জানা কথা। নির্ভেজাল প্রকৃতির ছায়ায় ছায়ায় এগোচ্চি। অনেক উপরে উঠতে হচ্ছে। সিঁড়িতে উঠার এক অভিনব কৌশল আবিষ্কার করলেন ইমরান ভাই। তার মতে সিঁড়ির এক কর্ণার দিয়ে একটু বাঁকা করে উপরের দিকে উঠলে কষ্ট কম হবে। এভাবে আপার সিনুয়া তারপর লোয়ার সিনুয়াতে গিয়ে রেস্ট। এখান থেকেই একবুক সাহস আর প্রচণ্ড দম নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যে যেতে হবে। কারণ মাঝখানে আছে কয়েক হাজার সিঁড়ি।

লোয়ার সিনুয়াতে মোবাইল এর নেটওয়ার্ক ভালোভাবে পাওয়া যায়। ইমরান ভাই আর টুটুল ভাই ফরজ (আবশ্যকীয় কথা বলতেই হবে) কাজগুলো সেরে নেয়। আমি আবার একদম নেটওয়ার্কের বাহিরে থাকি যখন ঘুরতে যাই। হট লেমন, ডিম মামলেট, জুস, মধুসহ যার যা আছে সব খেয়ে হাটা শুরু। মন্ত্র একটাই। শুরু করলে শেষ হবেই। হাজার সিঁড়ি পার হবার বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবেনা। শুধু বলব-শুয়ে কাত-চিত হয়ে, কখনো কখনো জিহ্বা বাহির করে সামনের দিকে ঝুঁকে নিঃশ্বাস ছেড়েছি। সিঁড়ি শেষ করে যে বিজয় চিহ্ন দিয়ে ছবি উঠিয়েছি তার সাথে বেস ক্যাম্প জয়ের আনন্দের কোন কমতি নেই।

চমরং। আতঙ্ক আর আনন্দ মিশে আছে যে নামের সাথে। কারণ এখান থেকেই কঠিন ট্রেক শুরু আর এখান থেকেই বলা যায় কষ্টের ট্রেক শেষ। আর এই চমরং ব্যতিত অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প এর দিকে যাওয়া সম্ভব না। এসিসি চেকপোস্টে মিশন কমপ্লিট এর কাগজাদি সই করিয়ে লাঞ্চ এর জন্য সেই প্যানারোমা হোটেল গন্তব্য এবার। এখানে ফেলে রেখে যাওয়া কিছু কাপড় ছিল সেগুলো বুঝে নিয়ে লাঞ্চ সেরে দ্রুততার সহিত চমরং বিদায় দিয়ে গন্তব্য এবার ঝিনু ডান্ডা। যদিও চমরং থেকে ঝিনু দেখা যাচ্ছিল একটু নিচেই কিন্তু হাজার হাজার খাড়া সিঁড়ি নামতে হাটুর অবস্থা নাজুক। একটু পা পস্কালেই কত বড় বিপদ হতে পারে তা বলা দুরূহ বিষয়। অবশেষে সাড়ে ১৯ কিলোমিটার হাটার পরিসমাপ্তি ঘটে দুপুর ২.৩৫ মিনিটে ঝিনু ডাণ্ডার তিব্বত রেস্টুরেন্টে চেকইন এর মাধ্যমে।

হট স্প্রিং! তাও আবার ন্যাচারাল! পাহাড় বেয়ে দুটি চৌবাচ্চায় গরম পানির ব্যবস্থা রয়েছে যা সম্পূর্ণ ন্যাচারাল। দ্রুত হোটেলে ব্যাগ রেখে হটস্প্রিং এর উদ্দেশ্যে ছুটলাম। প্রতিজন ১০০ রুপিতে টিকেট করে আরো আধা ঘন্টা হেঁটে উপস্থিত মদী খোলা নদীর পাশে অবস্থিত উন্মুক্ত হটস্প্রিং এর প্রান্তে। উষ্ম পানি যেন দীর্ঘ ট্রেকের ক্লান্তি সারাতে উষ্ম অভিবাদন জানালো। চারদিকে শীত অথচ এ পানি গরম আর অনিশ্বেষ। সত্যিই অবাক ও বিস্ময়ের ব্যাপার বটে। ফরেইনাররা দলে দলে আসছে। টানা ২ ঘন্টা এ পানিতে লুটোপুটি খেয়েছি। সন্ধ্যা নামবে এখুনি তাই ফিরতে হবে। রাতে হঠাৎ এক অপরিচিত লোক রুমে এসে বলল আপনারা কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? আহ- দীর্ঘ ৯ দিন পর দেশি ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েই গল্প জমে উঠল। ওয়াহিদ ভাই পেশায় ডক্টর। বসেন এ্যাপোলোতে। একাই এসেছেন। আড্ডার মাঝে দরজায় করাঘাত। ‘খানা রেডি হ্যাঁয়’ টেবিলে দেখি খাসির গোসত সাদা ভাত আর রুটি। পরে আবার ডিম মামলেট।

সকাল ৭ টা। নাস্তার টেবিল থেকে ডাক আসল। সাজানো আছে বম্বে রুটি আর হানি উইথ ডিম আইটেম। দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রাথমিক উদ্দেশ্য বাসস্ট্যান্ড। খানিক নেমেই ১৫ মিনিটের মত দীর্ঘ ঝুলন্ত ব্রিজ পার হতে হল যার নাম নিউ ব্রিজ। এটি মূলত কিউমি-সিউয়া এর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছে। আবার ট্রেক! ঘন্টা খানেক পরে কাঙ্ক্ষিত সিউয়া বাসস্ট্যান্ড। ছোট একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে সরাসরি পোখারার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। পথিমধ্যে অন্তিমকে বিদায় জানাতে হলো।

পোখারা। দুপুর ১২ টায় পৌঁছে গেলাম। ট্যুরিস্ট বাসস্ট্যান্ডে নেমেই মাছ-মুরগী দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ সারলাম। ইতিমধ্যে ইমরান ভাই ড্রাইবারের পিছনের ৪টি সিটের ৩টি কিনে নিল। এসে সে কি গল্প। আমরাও বাহবা দিয়ে কিভাবে ম্যানেজ হলো এ গল্প শুনতে চাইলাম। কিন্তু তখনো বুঝার বাকি ছিল যে কি ঘটতে যাচ্ছে আগামী কয়েকটি ঘন্টা। এ জার্নি ছিল ভয়ঙ্কর ও অভূলনীয়। প্রথমত ৪ জনের সিটে ৬ জন বসা। দ্বিতীয়ত বিদেশি বলে বাড়তি ভাড়া চাওয়া। তৃতীয়ত টানা ৫ ঘন্টা অট্টহাসি আর উচ্চস্বরের বকবকানি শোনা যা ছিল অসহনীয়। মনে মনে এটাই ঝপতে হয়েছে ছেড়ে দে মা কাইন্দা বাঁচি। রাত ৯.৩০ এ কাঠমুন্ডুতে নেমে রেহাই পেলাম।

অক্টোবর ৩১, হলউইন নাইট। রাতের থামেল এক অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। ওয়েও এ্যাপসের মাধ্যমে ইতিমধ্যে হোটেল ফেলসিটিতে রুম বুক দেয়া হয়ে গেছে। তার আগে পেটকে সান্তনা দিতে হবে। গন্তব্য সোজা আল মদিনা হোটেল। ব্যুফে স্টাইলে খাওয়া-দাওয়া চলল। সাথে আছে বাঙ্গালীদের বাংলা ভাষায় কথোপকথন। ট্যুরের চমক হিসেবে আবির্ভূত হলো কায়সার সজীব ভাই। চলল সারারাত থামেল ঘুরে বেড়ানো। হলউইন উৎসব উদ্‌যাপন।

পরের দিন নেপাল-তিব্বর বর্ডারে বাঞ্জি ও ক্যানিয়ন সুইং এক্টিভিটিতে সারাদিন কেটে যায়। কাঠমুন্ডু যখন ফিরি তখন রাত প্রায় ১০ টা। থামেল নেমেই গন্তব্য আল মদিনা হোটেল। সেখানে দেখা হল ‘ইয়ালা পিক’ জয়ীদের সাথে। বাংলাদেশের সুজন ও সাদিয়া রোপ-৪ এর পরিচালক মাহীভাইয়ের নেতৃত্বে গিয়েছিল এ অভিযানে। হোটেলেই দেখা মিলল কায়সার সজীবের সাথে। ইমরান ভাই সহ হালকা ভাবে রাতের ডিনার খেয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা শুরু। এদিকে টুটুল ভাই ব্যস্ত আসাদ ভাইয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষায়। দেখা হলো লিজেন্ড ভাই ও মামুন ভাইয়ের সাথে। রাত ২ টা পর্যন্ত চলে থামেলের বিভিন্ন স্পটে ঘোরাঘুরি।

সকাল ৮ টা। থামেলের দোকানপাট মাত্রই খুলছে। দ্রুততার সহিত শপিং শুরু। গণহারে কয়েকটা আইটেম কিনে ভৌদোড়। নাস্তাও করা হয়নি। বাংলাদেশ বিমানের ০০৭২ এর ফ্লাইট টাইম দুপুর ১.০০টা। বিমানবন্দরের ওয়াইফাই এর সাহায্যে অনলাইনে আসার সুযোগ হল। বিদায় নামাস্তে নেপাল। বিদায় ত্রিভূবন। ছোট্ট একটি স্ট্যাটাসে জানিয়ে দিলাম। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, আসছি তোমার তরে।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!