আমের রাজধানী চাঁপাই

আমের রাজধানী চাঁপাই

আমের দেশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এই জেলাটিকে কখনো নবাবগঞ্জ এবং চাঁপাই নামেও ডাকা হয়। ভারত উপমহাদেশ বিভাগের আগে এটি মালদহ জেলার একটি অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে এটি মালদহ থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্থানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং রাজশাহী জেলার একটি মহাকুমা হিসেবে গন্য হয়। ১৯৮৪ সালে একটি একক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আয়তন ১,৭৪৪ বর্গ কিলোমিটার। অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে সর্ব পশ্চিমে। এর পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা, উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলা, পশ্চিমে পদ্মা নদী ও মালদহ জেলা দক্ষিণে পদ্মা নদী ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামটি সাম্প্রতিকালের। জেলাবাসীর দাবির মুখে ২০০১ সালের ১লা আগস্ট সরকারিভাবে নবাবগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাখা হয়। পূর্বে এই এলাকা ‘নবাবগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল।চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ৫টি উপজেলায় বিভক্ত। এগুলি হলঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, গোমস্তাপুর, নাচোল, ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ উপজেলা।লোকসংস্কৃতি হিসেবে গম্ভীরা, কবিগান, আলকাপগান, মেয়েলীগীত, ছড়া, উপকথা, ধাঁধাঁ উল্লেখযোগ্য।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ,কারণ গ্রীষ্মকালীন এই ফলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্থনীতির প্রধান উৎস। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অধিকাংশ জমি বিভিন্ন ধরনের আমের গাছে ভরপুর থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি আম উৎপন্ন হয় শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় উৎপাদিত আমের মধ্যে হচ্ছে, ফজলি, ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, বোম্বাই অন্যতম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রতণসম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের রাজধানী হিসেবে শিবগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও দর্শনীয় নিদর্শন হিন্দু শাসন আমলে বিশেষ করে সেন বংশের শেষ রাজাদের খননকৃত দিঘী ও সুলতানী আমলে মুসলিম সুলতানদের নির্মিত মসজিদই এ উপজেলার প্রধান ঐতিহাসিক স্থাপনা। তাছাড়া বৃটিশ আমলে স্থানীয় জমিদারদেরও কিছু স্থাপনা শিবগঞ্জে দেখা যায়। এই জেলার ঐতিহাসিক সহাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ছোট সোনা মসজিদ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিঃ মধ্যে নির্মিত), শিবগঞ্জ; দারসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসা (১৪৭৯ খ্রিঃ), শিবগঞ্জ; ধনাইচকের মসজিদ (১৫ শতকে নির্মিত), শিবগঞ্জ; খঞ্জনদীঘির মসজিদ (১৫ শতকে নির্মিত), শিবগঞ্জ; দাখিল দরওয়াজা (১২২৯ খ্রিঃ), শিবগঞ্জ; শাহ সুজার কাছাড়ি বাড়ি (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিঃ মধ্যে নির্মিত), শিবগঞ্জ; তোহাখানা মসজিদ (১৬৩৬-১৬৫৮ খ্রিঃ মধ্যে নির্মিত), শিবগঞ্জ; শাহ নেয়ামতুল্লাহ (রহঃ) এর মাজার (১৬৬৯ খ্রিঃ নির্মিত), শিবগঞ্জ; বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এর মাজার (সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে ১৯৭১ খ্রিঃ নির্মিত), শিবগঞ্জ; কানসাট রাজবাড়ি, শিবগঞ্জ; চাঁপাই জামে মসজিদ (৮৯৩ হিজরিতে নির্মিত), সদর উপজেলা; মহারাজপুরের প্রাচীন মসজিদ (মুঘল আমলে নির্মিত), সদর উপজেলা; মাঝপাড়া প্রাচীন মসজিদ (১৭৭৫ খ্রিঃ নির্মিত), সদর উপজেলা; রামচন্দ্রপুরহাটের নীলকুঠি (১৮৫৯-৬১ খ্রিঃ, নীল বিদ্রোহের সাক্ষী) সদর উপজেলা; বারঘরিয়া কাছাড়ি বাড়ি (বর্তমানে বিলুপ্ত), সদর উপজেলা; বারঘরিয়া ও মহারাজপুর মঞ্চ, সদর উপজেলা; জোড়া মঠ (নির্মাণকাল অজ্ঞাত), সদর উপজেলা; নওদা বুরতজ, গোমসতাপুর; এক গম্বুজ বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, গোমসতাপুর; শাহপুর গড় (বাদশাহি আমলের রাজধানী সুরক্ষা বেষ্টনী), গোমসতাপুর; জাগলবাড়ি ঢিবি (৮ম শতাব্দী), ভোলাহাট; ছোট জামবাড়িয়া দারতস সালাম জামে মসজিদ, ভোলাহাট; বড়গাছী দক্ষিণ টোলা বাজার জামে মসজিদ, ভোলাহাট; রেশম কুটির ও চিমনি, ভোলাহাট; আলী শাহ্পুর মসজিদ, নাচোল; রাজবাড়ি, নাচোল; কেন্দুয়া ঘাসুড়া মসজিদ, নাচোল; কলিহার জমিদারবাড়ি, নাচোল; মল্লিকপুর জমিদারবাড়ি, নাচোল।

 

দর্শনীয় স্থান

  • আলপনা গ্রাম টিকইল, নাচোল
  • মহানন্দা নদী
  • ছোট সোনা মসজিদ
  • ছোট সোনা মসজিদ পার্ক
  • তোহাখানা
  • শাহ নেয়ামতুল্লাহ এর মাজার
  • চামচিকা মসজিদ
  • দারাসবাড়ি মসজিদ
  • ধানিয়াচক মসজিদ
  • স্বপ্নপল্লী
  • নাচোল রাজবাড়ী
  • বাবুডাইং
  • রহনপুর নওদা বুরুজ
  • গোয়াইন বাধ ৭ টি*
  • নীলকুঠি
  • মহানন্দা নদী
  • শুড়লার তেঁতুল গাছ
  • স্বপ্ন পল্লী পার্ক
  • টাংঘন পিকনিক পার্ক
  • কানসাটের জমিদার বাড়ি

কৃতি ব্যক্তিত্ব

  • ইলা মিত্র – উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী।
  • প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমদ – বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য।
  • প্রফেসর মো.রফিকুন নবী (র’নবী) – আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস এর
  • সাবেক পরিচালক। লে.জে. (অব) ড. আমিনুল করিম।
  • আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ – বাংলাদেশের আলোকচিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ, আধুনিক ফটোগ্রাফীর জনক, একুশে পদক প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রাচার্য।
  • বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান শেলি – ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা/অন্তবর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকার প্রধান, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি, মহান ভাষা আন্দোলের বীর সৈনিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, গবেষক ও লেখক।
  • প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মিজান উদ্দিন – শিক্ষাবিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য(২০১৩-২০১৭)।
  • মমতাজউদদীন আহমদ – নাট্যকার, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ।
  • ভাষা সৈনিক – এ্যাডভোকেট ওসমান গণি
  • রাজিত রহমান – (১৯৯২-২০১২)কানসাট আন্দোলনের প্রথম কবি
  • লে. জে. (অব) ড. আমিনুল করিম, সেনা কর্মকর্তা

কিভাবে যাবেন?

সড়ক পথে- ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ৩২০ কিঃমিঃ। ঢাকার গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাবার জন্য এসি-ননএসি বাস পাওয়া যায়। এর মধ্যে দেশ ট্রাভেলস, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, তুহিন এলিট, গ্রামীণ ট্রাভেলস উল্লেখযোগ্য।

  • দেশ ট্রাভেলস, ☎ ০১৭৪৬৪৭৪৭৮০
  • ন্যাশনাল ট্রাভেলস, ☎ ০১৭২৭৫৪৫৪৬০
  • হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ☎ ০১৭২০২১৪৭৮৫
  • তুহিন এলিট, ☎ ০১৯১৪৯৯৫৫২১
  • গ্রামীণ ট্রাভেলস, ☎ ০১৭০১৬৮৬৩২০
  • শ্যামলী পরিবহণ
  • একতা পরিবহণ

নন-এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং এসি বাসের ১১০০ টাকা। এসি বাসের ভাড়া বাসের ধরণ ও সময়ভেদে কম বেশি হতে পারে।

রেলপথ- চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাথে কোন আন্তঃনগর রেলের সংযোগ নেই। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ‘রাজশাহী এক্সপ্রেস’ সকাল সাড়ে ১০ টায়, ‘মোহনা এক্সপ্রেস’ রাত ৭ টা ৪৫ মিনিটে এবং ‘রাজশাহী কমিউটার’ সকাল ৯ টা ২৫ মিনিটে ছেড়ে যায়। রাজশাহী থেকে নবাবগঞ্জ যেতে প্রায় ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট সময় লাগে।

  • ক্রমিক নং পরিবহন সংস্থার নাম      ঢাকা কাউন্টার  চাঁপাই কাউন্টার                যাত্রী প্রতি ভাড়া
  • ১হানিফ এন্টারপ্রাইজ ০১৮১৩-০৪৯৫৪৩(কল্যানপুর) ০১৭১৩-২০১৭০১            ৫০০/-নন-এসি
  • ২মডার্ণ এন্টারপ্রাইজ ০১৭১১-২২৮২১৭            ০৭৮১-৫৬০২৫               ৫০০/-নন-এসি
  • ৩ন্যাশনাল ট্রাভেলস ০১৭১১-২২৮২৮৬          ০১৭৩০-০৭৩২৬৮         ৫০০/-নন-এসি

প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবধি এ সমস্ত পরিবহন সংস্থার যাত্রীবাহী বাস একঘন্টা/আধাঘন্টা অন্তর ঢাকা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলাচল করে। এ সবের বাইরে লতা, নাহার, সাথী, দূরদূরান্ত ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার বাসও প্রতিদিন নিয়মিতভাবে ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচল করে।

জেলার অভ্যন্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থাজেলা সদরের সঙ্গে আন্তঃউপজেলা যোগাযোগ মূলত সড়ক পথেই হয়ে থাকে। তবে নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলা সদরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন উপজেলা শহর ও জেলা সদরের মাঝে অসংখ্য বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদি যানবাহন চলাচল করে।

আকাশ পথে- রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে হয়।

খাওয়া দাওয়া

কালাইয়ের রুটী এবং মরিচ ভর্তা এখানকার স্থানীয় এবং জনপ্রিয় খাবার।

 

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!