নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের বেলাভূমি- কক্সবাজার

নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের বেলাভূমি- কক্সবাজার

বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ বেলাভূমি, উচ্ছ্বসিত সমুদ্রতরঙ্গ, দিগন্তপ্রসারী ঝাউবন, উচু পাহাড়ের চূড়া, দ্বীপ সমাহার, সুদৃশ্য প্যাগোডা, বৌদ্ধ মন্দির ইত্যাদি নিয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের প্যাকেজ খ্যাত কক্সবাজার জেলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত যা কক্সবাজার শহর থেকে বদরমোকাম পর্যন্ত একটানা ১৫৫ কিলোমিটার (৯৬ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশান। একসময় কক্সবাজার পানোয়া নামেও পরিচিত ছিল যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে হলুদ ফুল। এর আরো একটি প্রাচীন নাম হচ্ছে পালঙ্কি।

কক্সবাজার চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৫২ কিঃমিঃ দক্ষিণে অবস্হিত। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ৪১৪ কি.মি.। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত অনেক হোটেল, বাংলাদেশ পর্যটন কেন্দ্র নির্মিত মোটেল ছাড়াও সৈকতের নিকটেই দু’টি পাঁচতারা হোটেল রয়েছে। এছাড়া এখানে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে ঝিনুক মার্কেট। সীমান্তপথে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে আসা বাহারি জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে বার্মিজ মার্কেট। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কক্সবাজারে সৈকত সংলগ্ন আরও অনেক দর্শনীয় এলাকা রয়েছে যা পর্যটকদের জন্য প্রধান আকর্ষণের বিষয়।

কক্সবাজারে বিভিন্ন উপজাতি বা নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাস করে যা শহরটিকে করেছে আরো বৈচিত্র্যময়। এইসব নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা সম্প্রদায় প্রধান। কক্সবাজার শহর ও এর অদূরে অবস্থিত রামুতে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বৌদ্ধ মন্দির। কক্সবাজার শহরে যে মন্দিরটি রয়েছে তাতে বেশ কিছু দুর্লভ বৌদ্ধ মূর্তি আছে। এই মন্দির ও মূর্তিগুলো পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ ও কেন্দ্রবিন্দু। কক্সবাজারে শুধু সমুদ্র নয়, আছে বাঁকখালী নামে একটি নদীও। এই নদীটি শহরের মৎস্য শিল্পের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে বিখ্যাত।

কক্সবাজারের উত্তরে-চট্রগ্রাম, পূর্বে-বান্দরবান পার্বত্য জেলা ও মিয়ানমার, পশ্চিম ও দক্ষিনে-বঙ্গোপসাগর। জনসংখ্যা- ২২,৮৯,৯৯০ জন। আয়তন-২,৪৯১.৮৬ বর্গ কিঃমিঃ, উপজেলা -০৮ টি, পৌরসভা-৪টি, ইউনিয়ন: ৭১ টি, গ্রাম- ৯৯২ টি। প্রধান নদনদী: মাতামুহুরী, বাঁকখালী, রেজু, কোহালিয়া ও নাফ, প্রধান দ্বীপ: মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহ্পরীর দ্বীপ, মাতারবাড়ী, ছেডাঁ দ্বীপ ও সেন্টমার্টিন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ৩টি, বধ্যভূমি ১টি। উখিয়া, সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, টেকনাফ, রামু ও পেকুয়া।

 

দর্শনীয় স্থান

  • কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
  • হিমছড়ি
  • হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান
  • ইনানী সমুদ্র সৈকত
  • সেন্টমার্টিন দ্বীপ
  • ছেঁড়া দ্বীপ
  • শাহপরীর দ্বীপ
  • সোনাদিয়া দ্বীপ
  • কুতুবদিয়া দ্বীপ
  • মহেশখালী দ্বীপ
  • ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
  • শাহ ওমরের সমাধি, চকরিয়া
  • মানিকপুরের ফজল কুকের সাতগম্বুজ মসজিদ
  • মাথিনের কূপ , টেকনাফ
  • রামকোট বৌদ্ধ বিহার
  • রাখাইন পাড়া
  • অগ্গমেধা বৌদ্ধ বিহার
  • আদিনাথ মন্দির
  • ইলিশিয়া জমিদার বাড়ি
  • কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
  • টেকনাফ বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য
  • নাফ নদী
  • ফাসিয়াখালি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য
  • বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম
  • মগনামা ঘাট
  • মাথিন কূপ, টেকনাফ
  • মেধা কচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান
  • মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার
  • রাখাইন পাড়া
  • রামু সেনানিবাস
  • রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার
  • শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম

 

কৃতী ব্যক্তিত্ব

  • অজিত কুমার রায় বাহাদুর –– জমিদার;
  • আবুল কালাম আজাদ –– প্রথম জিপি, কক্সবাজার আইনজীবী সমিতি;
  • শফিউল আলম –– মন্ত্রীপরিষদ সচিব;
  • আব্দুর রহমান বদি –– রাজনীতিবিদ;
  • আলাউদ্দিন শাহ –– ইসলামী ব্যক্তিত্ব;
  • আহমেদুল হক সিদ্দিকী –– গীতিকার ও লোকশিল্পী;
  • এস এম নুরুল হক –– বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা;
  • তৌহিদুল আলম সবুজ –– ফুটবলার;
  • নুরুল হক শাহ (ডুলা ফকির) –– ইসলামী ব্যক্তিত্ব;
  • নুরুল হুদা –– বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা;
  • মমিনুল হক –– ক্রিকেটার;
  • মুহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী –– বাঙালি সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ;
  • মুহম্মদ নূরুল হুদা –– কবি, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক;
  • মোহাম্মদ ইলিয়াছ –– রাজনীতিবিদ;
  • শিরিন আক্তার –– শিক্ষাবিদ;
  • সত্যপ্রিয় মহাথের –– বৌদ্ধ পণ্ডিত;
  • সমরজিৎ রায় –– সঙ্গীতশিল্পী।

 

খাওয়া দাওয়া

প্রায় প্রতিটি আবাসিক হোটেল বা হোটেলের সন্নিকটে রেস্টুরেন্ট বা খাবার হোটেল রয়েছে। কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়ে পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ থাকে সাগরের বিভিন্ন মাছের মেন্যুর প্রতি। বিশেষ করে চিংড়ি, রূপচাঁদা, লাইট্যা, ছুরি মাছসহ মজাদার শুটকি মাছের ভর্তার প্রতিই পর্যটকদের আকর্ষণ বেশি থাকে। খাবারের মেন্যু অনুযায়ী একে রেস্টুরেন্টে একেক ধরনের মূল্য তালিকা দেখা যায়। তবে বর্তমানে সরকার নির্ধারিত কিছু কিছু তালিকা ভোজন রসিকদের আশ্বস্ত করেছে। মোটামুটি ১০-৫০০ টাকার মধ্যে সাধ ও সাধ্য অনুযায়ী মজাদার খাবার গ্রহণ করতে পারবেন। তবে খাবার গ্রহণের পূর্বে খাবারের নাম, মূল্য এবং তৈরির সময় সম্পর্কে জেনে নিন। প্রয়োজনে খাদ্যের তালিকা ও মূল্য টুকে রাখুন। তালিকা সঙ্গে মিলিয়ে বিল প্রদান করুন।

১। পউষী রেস্টুরেন্ট : কক্সবাজার শহরের কাছাকাছি অবস্থিত এই বাঙালি রেস্টুরেন্টটি। কক্সবাজার এর অন্যতম জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট এর মধ্যে এটি একটি। দুপুরের দিকে আপনি বেশ আয়েশ করেই খেতে পারবেন এখানে। সাদা ভাত এর সাথে নানা পদের ভর্তা, গরুর কালা ভুনা, ডাল, মুরগি ভুনা,  বিভিন্ন পদের মাছ পাবেন এখানে। তবে তাদের মূল আকর্ষন সামুদ্রিক লইট্টা মাছের ফ্রাই। অনেকেই লইট্টা মাছ পছন্দ করেন না। তবে তাদের স্পেশাল লইট্টা ফ্রাই আপনি একবার খেলে আর স্বাদ ভুলবেন না। বাঙালি খাবার ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বিরিয়ানি ও পাবেন। আর সব শেষে ডেজার্ট হিসেবে ফ্রুট কাস্টার্ড, পুডিং, ফিন্নি রয়েছে তাদের এখানে। 

২। হান্ডি : ইন্ডিয়ান খাবারের জন্য হান্ডি বেশ পরিচিত একটি রেস্টুরেন্ট।  কক্সবাজারে আসলে হান্ডি তে না খেলে ঠিক হয়না। তাদের হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি,  নান, ডাল মাখনি, মুরগির বাটার মশলা, কাবাব, তান্দুরি ইত্যাদি অনেক মজাদার। তবে যারা চাওমিন খেতে পছন্দ করেন, তারা হান্ডির চাওমিন টা ট্রাই করে দেখতে পারেন।

৩। সুগন্ধা বিচের কাকড়া ও মাছ: সুগন্ধা বিচ পয়েন্ট এ রাস্তার পাশেই রয়েছে সামুদ্রিক ভাজা মাছের ছোট ছোট দোকান। নানা ধরনের মাছ যেমন স্যামন, কোড়াল, টুনা, চিংড়ি, লবস্টার এসব মাছের ফ্রাই পাওয়া যায়। মাছ পছন্দ করে তাদের কে বললেই ভেজে দিবে গরম গরম। এছাড়াও চাইলে কাকড়া ও খেতে পারবেন আপনি।

৪। মারমেইড বিচ ক্যাফে: প্রিয়জনের সাথে একটু রোমান্টিক সময় কাটাতে চাইলে আপনি যেতে পারেন মারমেইড বিচ ক্যাফে তে। তবে এক্ষেত্রে আপনাকে পকেট এর কথা মাথায় রেখে নিতে হবে। নানা ধরনের সী ফুড এর জন্য বিখ্যাত তারা। স্কুইড, কালামারি, অক্টোপাস এর বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায় এখানে। এ ছাড়াও বিফ, চিকেন, মাটন, হাঁস এর নানা পদ পাওয়া যায়।

৫। কড়াই: সুগন্ধা বিচ পয়েন্ট এ কাবাব এর জন্য পরিচিত এই কড়াই রেস্টুরেন্ট টি অবস্থিত। নানা ধরনের মজাদার কাবাব এর দেখা মিলে এখানে। তান্দুরি, শিক, তাংরি,  চাপ,  টিক্কা এমন ই মজার মজার সব কাবাব এই দোকানে পাবেন। কাবাব খেতে চাইলে আপনি চলে যেতে পারেন সেখানে।

৬। ইনানি বিচের ভাজা পোড়াঃ পাথর ও কাকড়ার জন্য কক্সবাজার এর ইনানি বিচ বেশ বিখ্যাত। আপনি ইনানি বিচে ঘুড়তে গেলে খেতে পারেন নানা ধরনের ভাজা পোড়া। পিয়াজু, বেগুনি, চপ, ফুচকা ইত্যাদি পাবেন ইনানি বিচ এ। এছাড়াও সদ্য গাছ থেকে পাড়া কচি ডাবের ও দেখা মিলে এখানে।

 

কিভাবে যাবেন?

সড়ক পথে- ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪৪০ কি.মি.। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে কক্সবাজার রুটের বাসগুলো ছেড়ে যায়। তবে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, কমলাপুর, মতিঝিল ও আরামবাগ থেকে অধিকাংশ বাস ছেড়ে যায়। এই রুটে এসি ও নন-এসি উভয় ধরনের বাস রয়েছে। এই রুটে চলাচলকারী উল্লেখযোগ্য পরিবহনগুলোর মধ্যে রয়েছে – গ্রীন লাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী এন্টারপ্রাইজ, সোহাগ পরিবহন, সৌদিয়া, এস.আলম. পরিবহন, মডার্ন লাইন, শাহ বাহাদুর, সেন্টমার্টিন প্রভৃতি।

রেলপথ- ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারের সাথে এখনো কোনো রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। রেলে করে কক্সবাজার যেতে চাইলে আপনাকে প্রথমে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। চট্টগ্রামের চকরিয়া থেকে বিভিন্ন পরিবহনের অসংখ্য বাস রয়েছে সরাসরি কক্সবাজারে যাওয়ার। চকরিয়া থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৫৭ কি.মি.।

আকাশ পথে- ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারের সাথে বিমান যোগাযোগ রয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিদিন ঢাকা-কক্সবাজার ফ্লাইট চলাচল করে।

 

রাত্রি যাপন

কক্সবাজারককে বলা হয় বাংলাদেশের হোটেল শহর। এখানে অলিগলিতে খুজে পাবেন হাজারো হোটেল। 

 

দৃষ্টি আকর্ষনঃ যেকোন সমস্যা কিংবা তথ্যের প্রয়োজনে কল দিয়ে যোগাযোগ করুন। 

  • ৩৩৩- জাতীয় তথ্য সেবা 
  • ৯৯৯- জরুরী সেবা 

 

 

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!