হাজারিখিল: গহীন অরণ্যে ক্যাম্পিং

Back to Posts

হাজারিখিল: গহীন অরণ্যে ক্যাম্পিং

পৃথিবী সুন্দর। জীবন সুন্দর। সুন্দর চারপাশ। কিন্তু ব্যস্ততায় নিমজ্জিত হয়ে এ নিয়ে অনুধাবন কিংবা ভাবারও কখনো সময় হয়ে উঠেনা। হয়ত কোন কালে হয়ে উঠবে আর রবী ঠাকুরের মত বলতে হবে-

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া 
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ হতে সংগ্রহীত)

গহীন অরণ্যে তাবুতে রাত্রী যাপনের তীব্র ইচ্ছা ছিল। জোছনার আলোয় আলোকিত হবে চারদিক। রাত্রী বাড়ার সাথে বাড়তে থাকবে ঝি-ঝি পোকার শব্দ, বাদুড়ের ঝাঁপাঝাঁপি, শুকনো পাতার মর্মর শব্দ। সৃষ্টি হবে একটি ভৌতিক পরিবেশ। গা চমচম করে উঠবে। কিন্তু প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক ধরনের ভালা লাগা কাজ করবে। হারিয়ে যাব ঘুমের রাজ্যে। স্বপ্ন দেখব গহীন অরণ্যের রাজ্যে আমি রাজা।

Rope4 কর্তৃক আয়োজিত এডভেঞ্চার ক্যাম্প ‘শেয়ারিং এবং লার্নিং’ এর মাধ্যমে স্বপ্ন হাতের মুঠোয় ধরা দিল। মহিউদ্দীন মাহী ও মারুফা হকের নেতৃত্বে ২২ জনের (বার্সেলোনার কাতালুনিয়া প্রদেশের ১ জনসহ) গ্রুপের গন্তব্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারীখীল রিজার্ভ ফরেস্ট। ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত, ভারী বর্ষণ ও রাস্তার জ্যাম কে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছাই নির্দিষ্ট সময়ের তিন ঘন্টা পরে। প্রশিক্ষক সময়ক্ষেপন না করে বৃষ্টিতেই কার্যক্রম চালিয়ে গেল। শুরুতেই মিরিঞ্জা, ব্লাইন্ড, ওয়াইল্ড ও রেইন ফরেস্ট নামে ৪ টি গ্রুপে ২০ জনকে ভাগ করে দিল। ঘোষণা দিল সর্বোচ্চ পারফর্ম করা গ্রুপ ও সেরা ক্যাম্পারের জন্য থাকবে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

দলীয় কার্যক্রম চলতে লাগল। লাগাতার বর্ষণে আউটডোর ইভেন্টগুলো স্থগিত (আপাতত) রেখে ইনডোর ইভেন্টে প্রাধান্য দেয়া হল। শুরু হল মেধা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতার সাথে কৌশলের পরীক্ষা। মজাদার কিছু গেমসের এর মাধ্যমে পয়েন্ট ভাগাভাগি হলো। ইনডোরেই পর্বত আরোহন ও এক্সপেডিশনের মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হল। রোপ, হার্নেস, ক্যারাভিনার, ফিগার-৮, এ্যাঙ্কর, গ্লাভস, আইস এক্স, তাবু, ক্রেমপন, স্কার্ফ, হেড লাম্পসহ নানান যন্ত্রপাতির সাথে পরিচয় ও রোফ বাঁধার কিছু কৌশল দেখিয়ে দেয়া হল। দলীয় নেতাদের হাতে তাবু অর্পণ করে স্থাপনের এর দায়িত্ব দেয়া হল দলের সদস্যদের।

 

দিনের শেষভাগে বৃষ্টি কিছুটা কমলে রিভার ক্রসিং এর প্রশিক্ষণ শুরু হয়। লেকের উপর আড়াআড়ি ৫০ মিটারের চেয়ে বেশি দুরুত্বে রোপ বাঁধা হয়। চারপাশে ছিল অসংখ্য জোঁক। এরই মাঝে হার্নেস পড়িয়ে সাইফুল ভাইকে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ক্রসিং এর জন্য দেয়া হয়। শুরুটা ভাল হলেও ফেরার সময় হাফিয়ে উঠে তবে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে প্রায় সকলেই সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।

রাত্রী নামার সাথে সাথে ঘুটঘুটে কালচে অন্ধকারের আগমন। আঁধারে ঢেকে গেল চারপাশ। বৃষ্টিও খানিকের জন্য বিদায় নিল। একটি গ্রুপ ক্যাম্প প্রাঙ্গণে আড্ডায় মসগুল আরেকটি গ্রুপ স্থানীয় বাজারে চায়ের কাপে ধোঁয়া তুলল। আলোচনা, অভিজ্ঞতা শেয়ার, নানান পরিকল্পনা আরো কত কি! হঠাৎ বৃষ্টির আগমন লক্ষণীয় হলে ক্যাম্প প্রাঙ্গণের উদ্দেশ্য ভো-দৌড়।

রাতের খাবার শেষে বসল জলসার আসর। শুরুতে গানের কলি খেলা। মাহী ভাই যেন একটা গানের ভাণ্ডার। তার ভাষ্য মতে, ৫ ঘন্টা অনবরত গান বেরুবে সে যে শব্দ দিয়েই হোক। প্রতিপক্ষ ও সমানে সমান। আরো কিছু মজার গেমস ছিল যার মধ্যে একটি নিরীহ গ্রামবাসী-মাফিয়া নিয়ে। এ খেলাটি ছিল অনেক শিক্ষণীয়। এখান থেকে নিজের আত্ববিশ্বাস, কথা বলার গুরুত্ব, ধারণার প্রতিফলনের ফলাফল ও যা সাধারণত ভেবে থাকি তার বিপরীত যে ঘটে থাকে তা দেখা যায়।

রাত ১ টা। ঘুমের রাজ্য সবাইকে আহবান জানাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ একটি গ্রুপ তাবুতে আরেকটি গ্রুপ অফিস রুমের ফ্লোরেই ঘুমাবে। অতিরিক্ত বর্ষণে কাঁদায় একাকার অবস্থা দেখে বেশীরভাগই তাবুতে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। ২২ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জন যেতে রাজী হয় তবে যাওয়ার প্রাক্কালে জঙ্গলে জোক, অজগর, নানান বন্য প্রাণীসহ ও চিতা বাঘও আছে বলে জানা যায়। ভয় পেয়েও পিছু না হটে থাকার সাহস করে বৃষ্টিতে ভিজে কাঁদা মেখে তাবুতে রওয়ানা হলাম। একাই এক তাবুতে। ভয়ে গা চম চম করছে। চারদিকে গহীন জঙ্গল। অদ্ভদ সব শব্দ। সাথে আছে জুম বৃষ্টি। ভয় ঝেড়ে ফেলে লাইট বন্ধ করে সবকিছু উপভোগ করতে লাগলাম। তাবুর উপর শীল পড়ার মত বৃষ্টির ফোটা আর নীচ দিয়েও পানির গড়াগড়ি। সব মিলে ছিল জীবনের সেরা একটি উপভোগ্য রাত।

পিচ ঢালা রাস্তা ধরে চা বাগানের পাশ দিয়ে ঘুরি ঘুরি বৃষ্টিতে ২য় দিনের পথ চলা শুরু। কিছুদূর এগুলোই ডান পাশ হয়ে চলে গেছে ঝর্ণার ট্রেইল। সামনে কয়েকটি পাহাড় পাড়ি দিয়ে উঁচু একটি স্থানে এসে সমবেত হলাম। চারদিকের দৃশ্য ছবির মত লাগছিল। প্রকৃতির অপরূপ মায়াজালে বিদ্ধ প্রায়। নিজেকে সপে দিতে মন চায়। নগরবাউলের গান মনে পড়ে যায়-

ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে
হারিয়ে যাই লালন বেশে,
ছিনিয়ে নিয়ে একতারাটা
বাজাই সুখে!

প্রশিক্ষকের ডাকে সম্ভিত ফিরে আসে। ইতিমধ্যে ক্লাইম্বিং ও জুমারিং এর জন্য সেট তৈরী করা হয়েছে। সার্বিক সহযোগিতায় আছেন নীরব, ফরহাদ জিয়ন ও শান। এবার হৃষ্ট-পুষ্ট আতিক ভাইকে দিয়ে প্রায় ১০০ মিটার পাহাড় বেয়ে ক্লাইম্বিং ও জুমারিং শুরু। সফলভাবে শেষ করে তবে সময়সাপেক্ষ হয়। একে একে তাইতি, সাদিয়া, অন্তরা, শাহানা আপু, ড্যানিয়েল, ফাহিম ভাই, নাহিদ, আফিফ ও শামিম ভাই সহ সকলে ভালোভাবে সম্পন্ন করে।

 

এবার ফেরার পালা। ফিরতি পথে ট্রেইলে জলকেলিতে মাতোয়ারা হয়ে লাফঝাঁপ, ফটোশেসন ও দলগত খেলা ঘোড়দৌড় চলে। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় সেরা ক্যাম্পার মশিউর ও পারফর্মার দল ওয়াইল্ডের নাম। এছাড়াও বাকী সবার জন্য ছিল সান্তনা পুরষ্কার ক্যাম্প ব্যাজ। আগামীর পর্বত আরোহণে এ শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেবার প্রত্যয় ও অঙ্গীকার এবং যেকোন স্কুলে কিংবা যারাই ডাকবে সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করে শেষ হয় এডভেঞ্চার ক্যাম্প ‘শেয়ারিং এবং লার্নিং’। এগিকে যাক Rope4.

 

কামাল হোসাইন সৈকত

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!