জয়সালমিরঃ সোনালি প্রান্তরে, ভ্রমরার গুঞ্জরে

Back to Posts

জয়সালমিরঃ সোনালি প্রান্তরে, ভ্রমরার গুঞ্জরে

ব্যাকুল মন। সর্বদা মত্ত থাকে জয়ের নেশায়। একে একে জয় করেছি নদী, সমুদ্র, পাহাড়। এবার ইচ্ছা হলো মরু জয়ের। সার্ক শিক্ষা সফরে মরুভূমি দেখার বিষয়টি তালিকাভুক্ত হলো। মরুভূমি সংক্রান্ত ভয় সত্ত্বেও বন্ধুরা রাজি হলেন। আজ মনে হয় জয়সালমিরের মরুভূমি দেখার সময়টুকুই ভারত সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময়।

কিন্তু মরু জয় কি এতই সহজ? মরুভূমির নাম শুনলে সবার মনে প্রথমেই ভয়ের উদ্রেক হয়। মরু মানে খাঁ খাঁ রোদ। মাত্রাতিরিক্ত গরম। কোথাও ছায়া নেই। সূর্যের প্রচন্ড উত্তাপ থেকে লুকাবার জায়গা নেই। পানি নেই, মানুষ নেই। আছে শুধু বালি আর পাথর। উপরন্তু আছে হঠাৎ করে বয়ে যাওয়া বালুর ঝড়। বিশাল এলাকা জুড়ে বলা যায় এ যেন বালির সমুদ্র। প্রশ্ন করি নিজেকে! এই মরুভূমি কিভাবে সুন্দর হতে পারে? জয়সালমির থেকে গাড়িতে মরুভূমির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তপ্ত বাতাসে উষ্ণ বালির পরশ আর বাতাসের শনশন শব্দ জানিয়ে দিলো আমরা পৌঁছে গেছি মরুর রাজ্যে। তার আহবানে সাড়া দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম আমরা সবাই।

ড্রাইভার আকবর ভাই আমাদের বলছিলেন- থর মরুভূমি হচ্ছে বিশ্বের ৭ম বৃহত্তম মরুভূমি। এর আয়তন ২ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। মরুভূমিটির বেশির ভাগ অংশ ভারতের রাজস্থান অঙ্গরাজ্যে পড়েছে। তবে ভারতের হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্যের দক্ষিণভাগে এবং গুজরাট রাজ্যের উত্তরভাগেও থর মরুভূমি প্রসারিত হয়েছে। পাকিস্তানে মরুভূমিটি সিন্ধু প্রদেশের পূর্ব অংশ এবং পাঞ্জাব প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে প্রসারিত হয়েছে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে চোলিস্থান নামের আরেকটি মরুভূমি থর মরুভূমির সাথে মিলিত হয়েছে। তার মানে চারদিকে বিশাল এক ধু ধু প্রান্তর। যা সীমানাকে অতিক্রম করে যেন ছড়িয়ে আছে।

আবার প্রশ্ন করি মরুভূমি কি সুন্দর? হ্যাঁ অবশ্যই সুন্দর। প্রথম দর্শনে বিস্মিত হলাম। যেখানেই দাঁড়িয়ে দেখি না কেন চারিদিকে একই রকম মনে হয়। সূর্য কিরণ মরুভুমিকে উত্তপ্ত করে, রুক্ষ করে, শুষ্ক করে। কিন্তু মরুভূমি আপন মনে বাতাসের দোলায় রচনা করে নতুন এক জীবনের ছন্দ। এক দিকের বাতাস আরেক দিকের বালিতে এঁকে দিচ্ছে মনোমুগ্ধকর শিল্পকর্ম। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম বাতাস আর বালির এই কারুকাজ। বিশাল বালির প্রান্তরে অনবরত চলে ছবি আঁকার খেলা। কোথাও গহ্বর, কোথাও উঁচু ঢিবি। কোথাও ছোট ছোট দেয়াল। আবার ক্ষনে ক্ষনে এসব দৃশ্যও পাল্টে যায়- রচিত হয় নতুন কোন চিত্র-শৈলী। যা মোঘলদের শিল্পকর্ম কেও বুঝি হার মানায়। মরুভূমিতেও জেগে উঠে ক্যাকটাস, ছোট ঝোপ ঝাড়। শুষ্কতার মাঝেও প্রাণের সঞ্চার হয়। এখানেও রাজত্ব করে মরু-সিংহ। এছাড়াও আছে মরুদ্যান যেখানে পানি ও সবুজ বৃক্ষ মানুষের তৃষ্ণা মেটায়। সে উষ্ণ ভূ-প্রকৃতিতেও মানুষ বাসা বাধে।

মরুভূমি দেখার সর্বোৎকৃষ্ট আকর্ষণ উটের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো বা “ক্যামেল সাফারি”। উট হচ্ছে মরুভূমির জাহাজ। পাঁচটি উটের পিঠে আমরা দশজন চড়লাম। জীবনে প্রথম উটের পিঠে চড়ে হাত পা ছড়িয়ে মনে হলো বিশ্বজয়ের আনন্দ লাভ করলাম। উটের রশি ধরে সওয়ারি টানছে আর আমরা রাজকীয় কায়দায় উপরে বসে আছি। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে ফেলাম যখন উট উঠে দাড়ালো। উট যখন পা ভাঁজ করে উঠে দাঁড়ায় আর পা ভাঁজ করে জমিনে ল্যান্ড করে তখন প্রচন্ড ধাক্কা লাগে। এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। পিঠের সওয়ারির তখন আত্না দেহ থেকে বের হওয়ার উপক্রম হয়। সওয়ারিকেও প্রচন্ড শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। তা না হলে যে কোন সময় কুপোকাত হয়ে নিচে পড়ে যেতে পারে। এত ভীতিকর হলেও বন্ধু আতিক ও শরিফ এত কম ভয়ে খুশি নয়। তারা আরো ভয়ের আনন্দ পাওয়ার জন্য “ক্যামেল রেসিং” করলো। উটের পিঠ থেকে মরুভূমির ভেতরে গিয়ে যখন নামলাম তখন মনে হলো ১০-১১ ফুট নীচে নেমে গেছি। আর নিজেকে অনেক খর্বাকৃতির বেটে মনে হচ্ছিল। বিশাল মরুভুমিতে নিজেদেরকে ক্ষুদ্র মনে হলো।

মরুভূমিতে সবচেয়ে সুন্দর সময় সুর্যাস্ত দেখা। সারাদিন সোনালী আলো ছড়িয়ে দিনের শেষে সূর্য উজ্জ্বল লাল রং এর আচ্ছাদনে অনেক দূরের দিগন্তে হারিয়ে যেতে চায়। কিন্তু অনেকক্ষন পর্যন্ত তার আভা আকাশে ছড়ানো থাকে। আকাশ জুড়ে থাকে প্রথমে কমলা- তারপর লাল- তারপর নীল ও হালকা বেগুনী। সবশেষে কালো রং এর ছোঁয়া। সারাদিন ধরে যে সোনালি রোদ্দুর বালিরাশিকে সোনালু করে রেখেছে তার আবেশ দীর্ঘক্ষন টিকে থাকে। এ যেন আলো-বাতাস-রংয়ের সম্মিলনে রচিত এক মনোহর নান্দনিকতা। আমার কাছে এ সুন্দরের বর্ণনা জানতে চাইলে বলবো, আমি কিছু দেখিনি। তবে অনুভব করেছি। মরুভূমির আনন্দ হৈ-হুল্লোরে নয়, প্রশান্তিতে।

মরুভূমি ভীতিকর সুন্দরের প্রতীক। সমুদ্রের মত সে সক্রিয় নয়, সে নিস্ক্রিয়। মরুভূমি সহজ-সরল, তবে সে পরিধান করে রহস্যের নেকাব। মরুভূমি শান্ত তবে সে মায়াবী। মরুভূমি নিজেকে চেনায় না, তবে তাকে চিনে নিতে হয়। মরুভূমি প্রেম নিবেদন করে না, তবে মানুষ তার প্রেমে পড়ে যায়। আমি বলি, মরুভূমি তুমি অপরূপ। আর তারই প্রমাণ সূর্য বিদায় কালে বন্ধুদের গাওয়া গান।

মুনমুন বেসুরেই গাইলো- সোনালি প্রান্তরে, ভ্রুমরার গুঞ্জরে, দখিনা পবনেতে অন্ধ আবেগে থাকেনা মন ঘরে…..এবার সৈকত ও অধিনা গাইতে শুরু করল… বারে বারে যেন আসি ফিরে এমন দেশে, উষ্ণ বালির বুকে সূর্য যেথায় উঠে হেসে।।। নিপা ও ফরিদ গেয়ে উঠল… ভালোবাসা। কত আশা। ছড়ানো এ বাতাসে।। স্বপ্ন মাখা। মেঘের নকশা। জড়ানো এই আকাশে।। এবার সবাই মিলে গাইলাম…… স্বপ্ন জড়ানো মন চেয়ে থাকে অনুক্ষন। এই কথা জানায় বারে বারে। সোনালি প্রান্তরে… ভ্রুমরার গুঞ্জরে।।।

মুহুর্তেই ঝুপ করে চারপাশ আঁধারে ঢেকে গেলো। আকাশে জেগে থাকলো লক্ষ লক্ষ তারা। চাঁদের মিষ্টি আলোয় উটের দেখানো পথে আমরা মরুদ্যানে গেলাম। ওয়েসিস ক্যা¤প সান স্যাম ডিউন্সে ঢুকলাম। ঢুকতেই রাজস্থানী পোশাক পরিহিত একদল নারী-পুরুষ আমাদের কপালে তিলক দিয়ে বরণ করে খোলা আকাশের নিচে একটি আসরে নিয়ে গেলো। আসরটি ছিলো নাচ ও গানের। মাঝখানে মস্ত বড় উঠান। উঠান ঘিরে রাজসিক তাকিয়া রাখা। গদাই লস্করি চালে পাশবালিশে হেলান দিয়ে জমিয়ে বসি। এক পাশে বৈঠকি ঢঙে রাজস্থানি বাদ্য বাজাতে থাকেন দক্ষ বাদক। বাজনার তালে তালে তাঁদের দেহ দুলতে থাকে মরুভূমির র‌্যাটল স্ন্যাকের মতো।

ঘোষক এবার গলা চড়িয়ে বললেন, “আব দেখিয়ে না, হাম লোগোকি ট্যাডিশনাল কালভেলিস নৃত্যা”। শুরু হলো ভয় ধরানো আর বিস্ময়মাখা অদ্ভুত এক নাচ। আগুনের মধ্যে দিব্যি নেচে গেলেন তাঁরা। মাথায় নয়টা হাঁড়ি চাপিয়ে মোহনীয় ভঙ্গিতে নেচে-গেয়ে অতিথিদের মন মাতালেন। নটরাজ হয়ে ভাঙা কাঁচের ওপর তান্ডব দেখালেন নৃত্যের ভঙ্গিতে। সবচেয়ে সুুন্দর ছিল রঙীন খাগড়া দুলিয়ে রাজস্থানী নাচ। কালভেলিস নৃত্য শেষে শুরু হলো রাজস্থানী গান। নেশা ধরানো অচেনা ভাষার অদ্ভুত সেই গান। এছাড়াও সুন্দর সুন্দর কিছু পরিচিত গানও গাইল। নিম্বুরা নিম্বুরা নিম্বুরা…. অনুষ্ঠানের শেষ দিকে নাচনেওয়ালীরা হাত ধরে টেনে স্থানীয় ও হিন্দি গানের সাথে নাচতে জোরাজুরি করে। নাচ তেমন একটা না জানার কারণে প্রথমে আমরা আপত্তি করি। কিন্তু এত বর্নিল চোখ ধাঁধানো নাচ-গানের আসরে কি চুুপ মেরে বসে থাকা যায়? তাই ডাকে সাড়া দিয়ে নাচ-গানের আসরে ডুবে গেলাম। পুরোপুরি মত্ত হয়ে গেলাম। এলোমেলো সে কি নাচ!!!

যাই হোক, অনেক রাত হলো। এবার হোটেলে ফিরতে হবে। ফেরার পথে শুনতে পেলাম স্যাম সান ডিউন্স সহ পুরো বিকেলের যে আনন্দময় সময়টি কাটালাম তা একটি প্যাকেজের মাধ্যমে করা হয়েছে। আর প্যাকেজটির মালিক বাংলাদেশি ভদ্রলোক! কথা শুনেতো কপালে চোখ উঠার মত অবস্থা। সুদূর থর মরুভূমিতেও বাংলাদেশি! অনেক ভালো লাগল। ভদ্রলোকের সাথে কথা হলো। তিনি বললেন- আমিও তো বাংলাদেশি, আমার বাড়ী চাঁদপুরে। ব্যবসায়িক কাজে এখানে থাকা হয়। তবে সময় পেলেই দেশে যাই। তার সাথে ছবি উঠালাম। তিনি আমাদেরকে আবারও বেড়াতে আসার নিমন্ত্রন করলেন। মরুভূমি থেকে জয়সালমির ফিরবো বলে গাড়ীতে উঠলাম। কিন্তু মন পড়ে রইল মরুভূমিতে। আর দেশের মানুষের সাক্ষাৎ পেয়ে মাতৃভূমির সান্নিধ্যের জন্য হৃদয় তৃষ্ণার্ত হয়ে গেল।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!