মায়াবী দ্বীপ মনপুরা

Back to Posts

মায়াবী দ্বীপ মনপুরা

প্রাকৃতির সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত মনপুরা বাংলাদেশের বৃহওম দ্বীপ ভোলা জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রূপালী দ্বীপ যার চতুর্দিক মেঘনা নদীবেষ্টিত। মনপুরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সারি সারি বাগান। মাইলের পর মাইল সবুজ বৃক্ষরাজির বিশাল ক্যাম্পাস, আশেপাশে জেগে উঠা অসংখ্য চর আর প্রত্যেকটি চরের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য। চরগুলোই যেন মনপুরার অলঙ্কার! চরাঞ্চলে শীত মৌসুমে অতিথি পাখির উড়ে বেড়ানো, হরিণের পালের ছোটাছুটি, সুবিশাল নদীর বুক চিড়ে ছুটে চলা জেলে নৌকা, ঘুরে বেড়ানো মহিষের পাল আর আকাশ ছোঁয়া কেওড়া বাগান কঠিন হৃদয়ের মানুষের মন ও ছুঁয়ে যায়। 

ল্যান্ডিং স্টেশন, হরিণের অভয়াশ্রম ও চৌধুরী প্রজেক্ট মনপুরায়। ল্যান্ডিং স্টেশনটি নদীর ৫০০ মিটার ভেতরে তৈরী করা। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু পর্যটকরা না, স্থানীয়রাও সময় কাটাতে আসে এখানে। রাতে এখানে বসলে মনে হবে, আপনি মেঘনা নদীর গভীরে ভাসছেন। কারণ তখন আপনার চারদিকে থাকবে পানি আর আপনি বসে থাকবেন পানির সামান্য উপরে। নদীর পানির স্রোত আর ঢেউয়ে মাঝে মাঝে স্টেশনটি কেঁপে উঠে, তখন মনে হবে এই বুঝি নদীতে ভেসে গেলাম।

এখানে এসে আপনি সাক্ষাৎ পেতে পারেন হরিণ দলের! এখানে রয়েছে একটি হরিণের অভয়াশ্রম। জোয়ারের সময় হরিণগুলো প্রধান সড়কের কাছে চলে আসে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হরিণের পাল যখন রাস্তা পার হয় তখন তিন থেকে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। অতিথি পাখির উড়ে বেড়ানো, হরিণের পালের ছোটাছুটি, সুবিশাল নদীর বুক চিরে ছুটে চলা জেলে নৌকা, ঘুরে বেড়ানো মহিষের পাল আর আকাশ ছোঁয়া কেওড়া বাগান কঠিন হৃদয়ের মানুষেরও মন ছুঁয়ে যায়। চারদিকে নদীবেষ্টিত মনপুরায় নৌকা কিংবা সাম্পানের ছপছপ দাঁড় টানার শব্দ আর দেশি-বিদেশি জাহাজের হুঁইসেলের শব্দ মিলেমিশে একাকার হলে মনে হয় কোনো দক্ষ সানাইবাদক আর তবলচির মন ভোলানো যুদ্ধ চলছে।

খাসি পাঙ্গাস, মহিষের দুধের কাঁচা দই ও শীতের হাঁস-এই তিনটি খাবার মনপুরার বেশ জনপ্রিয়। এ দ্বীপের প্রধান যানবাহন হচ্ছে মোটরসাইকেল। এছাড়া সাইক্লিং করার জন্য এই দ্বীপ খুবই উপযোগী। কখনো সবুজের রাজ্য আবার কখনো উত্তাল মেঘনা নদী রাস্তার পাশে রেখে মনপুরা দ্বীপে সাইক্লিং করার মজাই আলাদা।

অবস্থান

বাংলাদেশের বৃহওম দ্বীপ ভোলা জেলার মুল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা। মেঘনার কোল ঘেসে জেগে ওঠা তিন দিকে মেঘনার একদিকে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ সাজে সজ্জিত লীলাভূমি মনপুরা। ভোলা জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ পুর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেষে মেঘনার মোহনায় চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মনপুরা উপজেলা। আয়তন- ৩৭৩.১৯ বর্গ কিঃমিঃ, জনসংখ্যা- ১২৫,০০০ (আদমশুমারী ২০১১)।

একসময় এ দ্বীপে পর্তুগীজদের আস্তানা ছিলো। তারই নিদর্শন হিসেবে এখানে দেখতে পাওয়া যায় কেশওয়ালা কুকুর। ঐতিহাসিক ভাবে জানা যায়, মনগাজী নামে এখানকার এক লোক একদা বাঘের আক্রমনে নিহত হন। তার নামানুসারে মনপুরা নাম করন করা হয়।

চর: মনপুরায় ছোট বড় ১০টি চর ও বনবিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজ বিপ্লব। এই চরগুলো হলো- চরতাজাম্মুল, চর পাতালিয়া, চর পিয়াল, চরনিজাম, চর সামসুউদ্দিন, লালচর, ডাল চর ও কলাতলীর চর ইত্যাদি

দর্শনীয় স্থান

  • ৪ নং সাকুচিয়া ইউনিয়ন ম্যানগ্রোভ বন: 
    উপজেলা সদর থেকে ২০ কি.মি দক্ষিণে মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে চর পিয়াল আর চর পাতালিয়া নামে দুটি চরের ভিতরের বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ দেখতে পাওয়া যায়। এর আশেপাশে বিকেল বেলায় ঘুরতে গেলে হরিণের পাল দেখা যায়। এক কথায় এটি হরিণের অভয় বিচরন ভূমি।
  • মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশন: 
    হাজির হাট সদর থেকে পায়ে হেটে মাত্র ৫ মিনিটে ল্যান্ডিং স্টেশনে যাওয়া যায়। মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশন টি নদীর ৫০০ মিটার ভেতরে তৈরি করা। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু পর্যটকরা না স্থানীয়রা ও সময় কাটাতে আসে এখানে। রাতে এখানে বসলে মনে হবে আপনি মেঘনা নদীর গভীরে ভাসছেন। কারন তখন আপনার চারদিক থাকবে পানি আর আপনি বসে থাকবেন পানির সামান্য উপরে। নদীর পানির স্রোত আর ঢেউয়ে মাঝে মাঝে স্টেশন টি কেঁপে ওঠে। তখন মনে হবে এই বুঝি নদীতে ভেসে গেলাম। এটা এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
  • উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়ন ক্রসডেম এলাকা :
    উপজেলা সদর থেকে ৫ কি.মি দক্ষিণে উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়ন। অত্র ইউনিয়নের শুরুতেই ক্রসডেম এলাকা। এখানেই হরিণের বিচরন বেশি। এখান থেকে সূর্যাস্ত খুব ভালোভাবে দেখা যায়।
  • চৌধুরী প্রজেক্ট :
    মনপুরা উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৭ কি.মি দুরে চৌধুরী প্রজেক্ট অবস্থিত। প্রায় ৬ কি.মি দীর্ঘ ও ২ শ ১০ একর জমিতে গড়ে ওঠা প্রজেক্ট টি যে কোন পর্যটকের নজর কেড়ে নেবে নিমিষেই। প্রজেক্ট টিতে সারি সারি নারিকেল গাছ আর বিশাল আকৃতির ৫ টি পুকুর আছে। দৃষ্টিনন্দন চৌধুরী প্রজেক্ট টি হতে পারে পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। প্রজেক্ট টির পূর্ব পাশেই বিশাল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বাগান। মাঝেমধ্যে এখানে হরিণের বিচরন লক্ষ করা যায়।

খাবার দাবার:
মনপুরা দ্বীপে খাবার দাবার নিয়ে চিন্তার কোন কারন নেই। সেখানে নানান ধরনের খাবার পাওয়া যায়। তবে সবসময় খাসি বা গরুর মাংস পাবেন না। তবে এখানে বিশেষ কিছু খাবার না খেলেই নয়। যেমন মহিষের কাচা দুধ ও দধি, নদী থেকে ধরে আনা টাটকা ইলিশ, কোরাল, বোয়াল ও গলদা চিংড়ী। প্রচুর নারিকেল গাছ থাকায় গাছ থেকে পেড়ে মন ভরে ডাব খেতে পারবেন। মেঘনা নদী থেকে ধরে আনা টাটকা ইলিশ আর চর থেকে আনা মহিষের দুধ ও দধির স্বাদই আলাদা। তবে এখানকার সব খাবার ই ফরমালিন মুক্ত ও টাটকা।

কি করে ঘুরবেন: 
ঘুরবার জন্য রিকসা, মটর সাইকেল ও ব্যাটারি চালিত মিশুক পাবেন। সারাদিনের জন্য যে কোনো একটি বাহন রিজার্ভ করে আপনি ঘুরে দেখতে পারেন পুরো মনপুরা দ্বীপ। সব চেয়ে ভালো সল্যুশন মোটার সাইকেল ভাড়া করা। চালকই সব ঘুরে দেখাবেন আপনাকে। সারাদিনের জন্য হাজার টাকার মত নেবে। মোটর সাইকেল ড্রাইভারের নম্বর।নাম নয়ন, ফোন- ০১৭৬-৪৬৮৬৭৮২

তাছাড়া হাতে সময় নিয়ে গেলে ট্রলার বা স্পিড বোট রিজার্ভ করে ঘুরে আসতে পারেন মনপুরা দ্বীপের আশেপাশে জেগে ওঠা চর তাজাম্মুল, চর নিজাম, ঢাল চর, চর বদনা এবং কলাতলীর চর আর উপভোগ করতে পারেন প্রকৃতির অপরূপ রূপে সজ্জিত এসব চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

মনপুরা ভ্রমণ আপনাকে একটি বাড়তি সুযোগ এনে দিবে নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণ। মনপুরা আসলেই আপনি চলে আসবেন নিঝুম দ্বীপের খুব কাছাকাছি। যেই লঞ্চে মনপুরা আসবেন সেই একই লঞ্চে মনপুরা থেকে চলে যাওয়া যায় হাতিয়া। হাতিয়া যেতে এক ঘণ্টা সময় লাগে। হাতিয়া থেকে অল্প সময়ে ট্রলার যোগে চলে যাওয়া যায় নিঝুম দ্বীপ। অথবা মনপুরা থেকে স্পিড বোট বা ট্রলার ভাড়া করে চলে যাওয়া যায় নিঝুম দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপ বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে ওঠা এক নিঝুম অঞ্চল। এখানে আসলে একই সাথে পাবেন বন, সমুদ্র এবং দ্বীপ তিন ধরনের ল্যান্ডস্কেপ। এখানে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মতো অনুভূতি পাবেন কারন এটার চারদিক সমুদ্র বেষ্টিত। এখানে সুন্দরবনের ও ফিলিংস পাবেন কারন এখানে ম্যানগ্রোভ বন ও প্রচুর হরিণ দেখা যায়

ক্যাম্পিং সুবিধা :
ক্যাম্পিং করার জন্য মনপুরা একটি আদর্শ জায়গা। মনপুরা দ্বীপের যে কোনো জায়গায় ক্যাম্পিং করা যায়। যেখানে মন চায় সেখানেই তাবু টাঙ্গানো যাবে। চোর ডাকতের বালাই নেই, জন্তু জানোয়ারের ও ভয় নেই। আছে আদিগন্ত ভূমি। তেমন কিছু নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সবই পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। বলে রাখা ভালো যে পুরো মনপুরা দ্বীপ ঘুরে দেখতে চাইলে একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে নিন এবং তাতে করেই উপভোগ করুন মনপুরার সৌন্দর্য। মনে রাখবেন শুধুমাত্র সৌন্দর্য উপভোগ করলেই চলবে না, সেখানকার মানুষদের সাথে মেশার চেষ্টা করুন। দেখবেন তাদের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা পাবেন।

থাকার ব্যবস্থা : 
যারা ক্যাম্পিং করতে চান না তারা হোটেল বা গেস্ট হাউসে থাকতে পারেন। তবে সেগুলো একটু নিম্নমানের।

  • হোটেল দ্বীপ ( মোবাইল: 01713-965106)
  • প্রেস ক্লাব গেস্ট হাউস ( মোবাইল: 01913-927706)
  • হোটেল আইল্যান্ড ( মোবাইল: 01711-701286)
  • পানি উন্নয়ন বোর্ড ডাক বাংলো ( মোবাইল: 01923-376365)
  • উপজেলা পরিষদ ডাক বাংলো ( মোবাইল:) 
  • চৌধুরী সাহেবের বাংলো ( মোবাইল: 01934-175369)

কিভাবে যাবেন :
মনপুরা যেতে হলে নৌ পথই একমাত্র মাধ্যম। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন ২ টি লঞ্চ মনপুরা হয়ে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং হাতিয়া থেকে প্রতিদিন ২ টি লঞ্চ মনপুরা হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। তাছাড়া আরও ২ টি লঞ্চ আছে, একটি লঞ্চ প্রতিদিন ঢাকা থেকে হাতিয়া না যেয়ে শুধু মনপুরার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং অন্যটি মনপুরা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফিরে আসে।
ক) ঢাকা থেকে মনপুরার উদ্দেশ্যে বিকেল ৫ টায় ছেড়ে যায়:
১) এম ভি পানামা, (মোবাইল: 01711-349257)
২) এম ভি টিপু -৫ ( মোবাইল: 01711-348813)
প্রতিদিন এই দুটি লঞ্চের একটি ঢাকা থেকে মনপুরার উদ্দেশ্যে বিকেল ৫ টায় ছেড়ে যায় এবং অন্যটি দুপুর ১২ টায় মনপুরা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফিরে আসে।

খ) ঢাকা থেকে বিকেল ৫.৩০ মিনিটে মনপুরা হয়ে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে :
১) এম ভি ফারহান-৩ ( মোবাইল: 01785-630366)
২) এম ভি ফারহান-৪ ( মোবাইল: 01785-630368 থেকে 70 পর্যন্ত) 
প্রতিদিন এই দুটি লঞ্চের একটি ঢাকা থেকে মনপুরা হয়ে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে বিকেল ৫. ৩০ মিনিটে ছেড়ে যায় এবং অন্যটি দুপুর ১২ টায় হাতিয়া থেকে মনপুরা হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফিরে আসে।

গ) ঢাকা থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যে ৬.০০ টায় মনপুরা হয়ে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে :
১) এম ভি তাসরিফ-১ ( মোবাইল: 
২) এম ভি তাসরিফ -২ ( মোবাইল: 01730-476824)
প্রতিদিন এই দুটি লঞ্চের একটি ঢাকা থেকে মনপুরা হয়ে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে বিকেল ৬. ০০ টায় ছেড়ে যায় এবং অন্যটি দুপুর ১ টায় হাতিয়া থেকে মনপুরা হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফিরে আসে।
এই ৬ টি লঞ্চের মধ্যে পানামা ও টিপু ছাড়া বাকি ৪ টি লঞ্চই লাক্সারিয়াস। ভ্রমণে অনেক আনন্দ পাবেন ।

লঞ্চ ভাড়া:   
ডেক: মনপুরা পর্যন্ত মাথাপিছু ৩৫০ টাকা, মাস্টার কেবিন: ৫০০, সিঙ্গেল কেবিন: ১২০০, ডাবল কেবিন: ২২০০, ভি আই পি কেবিন : রুম ভেদে- ৪৫০০, ৫০০০,৫৫০০,৬০০০ টাকা করে।

টিপস: 

  • স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন, অনেক সম্মান এবং সুবিধা পাবেন
  • শুধুমাত্র বাংলালিংক, রবি ও গ্রামীনফোনের নেটওয়ার্ক পাবেন
  • পাওয়ার ব্যাংক রাখার চেষ্টা করুন।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!