পদ্মাপাড়ের মৈনট ঘাট : বাড়ির কাছে ‘মিনি কক্সবাজার’

পদ্মাপাড়ের মৈনট ঘাট : বাড়ির কাছে ‘মিনি কক্সবাজার’

নদীর বুকে সমুদ্রবিলাস করতে পারবেন এখন ঘরের কাছেই। ঢাকার দোহারে পদ্মার পাড়ে মিনি কক্সবাজার খ্যাত ‘মৈনট ঘাট’ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সবার কাছে।

ঘাট থেকে দূরে তাকালে সমুদ্রের বেলাভূমির আভাস মেলে। দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের মাথায় দুলতে থাকা নৌকা, প্রায় ডুবুডুবু স্পিডবোটের ছুটে চলা, পাড়ে সারিবদ্ধ বাহারি রঙের ছাতার তলায় পেতে রাখা হেলান-চেয়ার। ঘাটের কাছাকাছি দুই পাশে হোটেলের সারি। সেগুলোর সাইনবোর্ডে ঘাটের পরিচিতি ‘মিনি কক্সবাজার’।

ঢাকার দোহার উপজেলার পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর কোলে মৈনট ঘাট। দোহার থেকে দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। নদীর অপর পাড়ে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন। পদ্মা ভাঙতে ভাঙতে দোহারের প্রান্তে এখন চরমোহাম্মদপুরে এসে ঠেকেছে। এটাই মৈনট ঘাট।

নানান কারণে মৈনট ঘাট এখন ঢাকার মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এর প্রধান কারণ ঘাটের আশপাশে বিশেষ করে পূর্ব পাশে বিশাল চর আর সামনে বিস্তীর্ণ পদ্মা। এখান থেকে পদ্মা নদীতে নৌকায় ঘুরেও বেড়ানো যায় পাড় ধরে। তাছাড়া এ মৌসুমে প্রচুর রং-বেরং এর পালের নৌকাও দেখা যায় মৈনট ঘাটে।

মৈনট ঘাট থেকে পদ্মায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য আছে স্পিড বোট। আট জনের চড়ার উপযোগী একটি বোটের ভাড়া ত্রিশ মিটিটের জন্য দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এছাড়া ছোট বড় নানান আকারের ইঞ্জিন নৌকাও আছে। আড়াইশ থেকে ৮শ’ টাকা ঘণ্টায় এসব ইঞ্জিন নৌকায় চার থেকে ২০/২৫ জন একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো যায়।

পদ্মার প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে দুতিন ঘণ্টার জন্য ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে মৈনট ঘাটের কোলাহল ছেড়ে একটু দূর থেকে ঘুরে আসাই ভালো। মৈনট ঘাটে বেড়াতে গিয়ে পদ্মার মাছও কেনার সুযোগ আছে। নৌকা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখা হওয়া জেলে নৌকা থেকে মাছও কিনতে পারেন। তবে পদ্মার সেই টাটকা মাছের স্বাদ নিতে হলে দাম বেশ কিছুটা বেশিই গুনতে হবে।

 

প্ল্যান ও আরো কি কি দেখবেন

মৈনট ঘাট ও পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দিনের দ্বিতীয়ভাগই ভালো। সেখানে সূর্যাস্ত না দেখে ফেরা উচিৎ হবে না। তবে সারা দিনের একটি ভ্রমণ সূচী করে দিনের প্রথম অংশে বেড়াতে পারেন ঢাকার নবাবগঞ্জের প্রাচীন স্থাপনা ও স্থানগুলোতে। সকালে ঢাকা থেকে বেড়িয়ে প্রথমে দেখে নিন নবাবগঞ্জের কলাকোপার ঐতিহাসিক গান্ধী মাঠ, প্রাচীন প্রাসাদ, এন হাউজ, জগবন্ধু সাহা হাউজ এবং খেলারাম দাতার বাড়ি। এছাড়া নবাবগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন জজ বাড়ি ও উকিলবাড়ি দেখতেও ভুল করবেন না। ঢুঁ মারতে পারেন বান্দুরার জপমালা রাণীর গির্জায়ও।

যেভাবে যেতে হবে 

ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে যাওয়ার সব থেকে সহজ ও সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে বাস যোগে। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় যমুনা পরিবহনে বাস। প্রায় বিশ মিনিট পরপর বাস ছেড়ে যায়। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। বাস ছেড়ে দেওয়ার দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে নামিয়ে দেবে মৈনট ঘাট। সারাদিন অতিবাহিত করার পর ফেরার সময় একই বাসে আবার ঢাকায় চলে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে স্মরণ রাখা দরকার মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে দেয় সন্ধ্যা ৬টায়। ঋতু ভেদে কখনও কখনও সময়ের রকমফের হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে একই রুট ধরে অর্থাৎ বাসের রুটেই যেতে হবে। তা ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি করে ঢাকা থেকে স্বল্প দূরত্বে এটি ভ্রমণ উপযোগী একটি জায়গা।

কি কি খাবেন

খাওয়ার ক্ষেত্রে বলা যায় বেশির ভাগ মানুষেরই ইচ্ছা থাকে পদ্মার তীরে বসে পদ্মার ইলিশ খাওয়া। মৈনট ঘাটে খাবারের হোটেল আছে। এর মধ্যে আতাহার চৌধুরীর হোটেল এবং জুলহাস ভূঁইয়ার হোটেল হতে পারে খাবার খাওয়ার উপযুক্ত জায়গা। ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে চমৎকার খাওয়া হয়ে যায়। বড় ইলিশ খেতে চাইলে তার দাম একটু বেশি পড়ে যায়। ইলিশ ছাড়াও রয়েছে বোয়াল, চিংড়িসহ পদ্মা নদী অন্যান্য টাটকা মাছের বিভিন্ন পদ। নিকটেই কার্তিকপুর বাজারে ফাস্টফুডসহ একাধিক খাবারের দোকান বা হোটেল আছে। কার্তিকপুরের আর একটি খ্যাতি রয়েছে, তা হল এখানকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। নিরঞ্জন মিষ্টান্ন ভান্ডার, রণজিৎ মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং মুসলিম সুইটসসহ রয়েছে আরো বেশকিছু মিষ্টির দোকান। দুইশ থেকে চারশ টাকা কেজি দরে পাওয়া যায় খাঁটি ছানায় তৈরি বিভিন্ন পদের মিষ্টি।

সতর্কতা

সাঁতার না জানা থাকলে গোসল করার সময় নদীর বেশি গভীরে যাওয়া নিষেধ। পরিবেশের কথা ভেবে অপচনশীল দ্রব্য যেমন-পানির প্লাস্টিক বোতল, খাবার প্যাকেট, পলিথিন ইত্যাদি যেখানে সেখানে ফেলা থেকে বিরত থাকা। নৌ-ভ্রমণের সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরিধান করা।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *