সোনালী নওগাঁ

সোনালী নওগাঁ

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ভাগে, বাংলাদেশ-ভারত আমত্মর্জাতিক সীমারেখা সংলগ্ন যে ভূখন্ডটি ১৯৮৪-র পহেলা মার্চের পূর্ব পর্যমত নওগাঁ মহকুমা হিসেবে গণ্য হত, তাই হয়েছে এখন বাংলাদেশের কণ্ঠশোভা নওগাঁ জেলা।উত্তরে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর, দক্ষিণে বাংলাদেশের নাটোর ও রাজশাহী, পূর্বে জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের মালদহ ও বাংলাদেশের নবাবগঞ্জ জেলা, এরই অন্তর্বর্তি ভূ-ভাগ এই নওগাঁ জেলা।

এ জেলার আয়তন ৩,৪৩৫.৬৭ বর্গ কিমি। জনসংখ্যার ঘনত্ব ৭৫৭ জন/কিমি (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০১১)। পত্নীতলা, ধামইরহাট, মহাদেবপুর, পোরশা, সাপাহার, বদলগাছী, মান্দা, নিয়ামতপুর, আত্রাই, রাণীনগর ও নওগাঁ এই এগারোটি উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁ জেলাকে ভূমির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ক) বরেন্দ্র অঞ্চল, খ) বিল বা ভর অঞ্চল এবং গ) পলি অঞ্চল।

নওগাঁর উত্তরে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর, দক্ষিণে বাংলাদেশের নাটোর ও রাজশাহী জেলা, পূর্বে জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের মালদহ ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। এ জেলায় সাওতাল, উরাও, মুন্ডা, সুরিয়া পাহাড়ি, মাহালি, বাঁশফোড়, কুরমি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টীদের বসবাস আছে।

নওগাঁ জেলায় উন্নীত হয়ঃ ১ মার্চ, ১৯৮৪ খ্রিঃ আয়তনঃ ৩,৪৩৫.৬৭ বঃকিঃ (১,৩২৬.৫২ বঃমাঃ)। লোক সংখ্যাঃ ২৩,৮৫,৯০০ জন ( পুরুষ-১২,৩০,০০০ জন এবং মহিলা-১১,৫৫,৯০০জন)। উপজেলা- ১১ টি। পৌর সভা ০৩ টি। ইউনিয়ন- ৯৯টি। গ্রাম- ২৮৫৪টি। উপজেলাগুলো হচ্ছে- পত্নীতলা, ধামইরহাট, মহাদেবপুর, পোরশা, সাপাহার, বদলগাছী, মান্দা, নিয়ামতপুর, আত্রাই, রাণীনগর, নওগাঁ সদর উপজেলা। নওগাঁ জেলার পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত পুনর্ভবা, মধ্যবর্তী আত্রাই এবং পূর্বভাগে যমুনা এই জেলার প্রধান নদী। যমুনাও মূলত তিস্তা নদীরই একটি শাখা। প্রধান নদী: আত্রাই, পুনর্ভবা, ছোট যমুনা, নাগর, শিব; চলন বিল উল্লেখযোগ্য।

লোকসংস্কৃতি সঙ্গীত: পল্লীগীতি, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া ও মেয়েলী গান উল্লেখযোগ্য। উৎসব: বাংলা নববর্ষ, চড়কপূজা, নবান্ন, হালখাতা, বেরাভাসন, পহেলা বৈশাখ উল্লেখযোগ্য। খেলাধূলা: হা-ডু-ডু, নৌকাবাইচ, দাড়িয়াবান্ধা, লাঠিখেলা উল্লেখযোগ্য।

নওগাঁ শব্দর উৎপত্তি হয়েছে ‘নও’ (নতুন -ফরাসী শব্দ ) ও‘ গাঁ’ (গ্রাম ) শব্দ দু’টি হতে । এই শব্দ দু’টির অর্থ হলো নতুন গ্রাম । অসংখ্য ছোট ছোট নদীর লীলাক্ষেত্র এ অঞ্চল । আত্রাই নদী তীরবর্তী এলাকায় নদী বন্দর এলাকা ঘিরে নতুন যে গ্রাম গড়ে উঠে , কালক্রমে তা-ই নওগাঁ শহর এবং সর্বশেষ নওগাঁ জেলায় রুপান্তরিত হয়। নওগাঁ শহর ছিল রাজশাহী জেলার অন্তর্গত । কালক্রমে এ এলাকাটি গ্রাম থেকে থানা এবং থানা থেকে মহকুমায় রুপ নেয় । ১৯৮৪ এর ১ মার্চ- এ নওগাঁ মহকুমা ১১টি উপজেলা নিয়ে জেলা হিসেবে ঘোষিত হয় । বাংলাদেশ উত্তর -পশ্চিমভাগ বাংলাদেশ – ভারত আন্তর্জাতিক সীমা রেখা সংলগ্ন যে ভূখন্ডটি ১৯৮৪ খ্রিঃ এর ১ মার্চের পূর্ব পর্যমত্ম অবিভক্ত রাজশাহী জেলার অধীন নওগাঁ মহকুমা হিসেবে গণ্য হ-তো, তা – ই এখন হয়েছে বাংশাদেশরে কন্ঠশোভা নওগাঁ জেলা । নওগাঁ প্রাচীন পৌন্ড্রবর্ধন ভূক্ত অঞ্চল ছিল। অন্য দিকে এটি আবার বরেন্দ্র ভূমিরও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নওগাঁর অধিবাসীরা ছিল প্রাচীন পুন্ড্র জাতির বংশধর । নৃতাত্বিকদের মতে , পুন্ড্ররা বিশ্বামিত্র বংশধর এবং বৈদিক যুগের মানুষ। মহাভারত পুন্ড্রদের অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমার ঔরষজাত বলি রাজার বংশধর বলে উলে­খ করা হয়েছে । আবার কারো মতে, বাংলার আদিম পাদদর বংশধর রুপে পুন্ড্রদের বলা হয়েছে । এদিক দিয়ে বিচার করলে নওগাঁ যে প্রাচীন জনগোষ্ঠির আবাসস্থল ছিল তা সহজেই বলা যায় ।

নওগাঁ জেলা আদিকাল হতেই বৈচিত্র ভরপুর । ছোট ছোট নদী বহুল এ জেলা প্রাচীনকাল হ- তেই কৃষি কাজের জন্য প্রসদ্ধি । কৃষি কাজের জন্য অত্যমত্ম উপযোগী এলাকায় বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে অসংখ্য জমিদার গোষ্ঠী গড়ে উঠে । এ জমিদার গোষ্ঠীর আশ্রয়েই কৃষি কাজ সহযোগী হিসেবে খ্যাত সাঁওতাল গোষ্ঠীর আগমন ঘটতে শুরু করে এ অঞ্চল । সাঁওতাল গোষ্ঠীর মতে এ জেলায় বসবাসরত অন্যান্য আদিবাসীদের মধ্যে মাল পাহাড়িয়া, কুর্মি,মহালী ও মুন্ডা বিশেষভাবে খ্যাত । নানা জাতি ও নানা ধর্মর মানুষের সমন্বয়ে গঠিত নওগাঁ জেলা মানব বৈচিত্র্য ভরপুর । অসংখ্য পুরাতন মসজিদ , মন্দির,গীর্জা ও জমিদার বাড়ি প্রমাণ কর নওগাঁ জেলা সভ্যতার ইতিহাস অনেক পুরাতন।

 

দর্শনীয় স্থান

  • পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার
  • কুসুম্বা মসজিদ
  • বলিহার রাজবাড়ী
  • ভবানীপুর জমিদার বাড়ি
  • রঘুনাথ মন্দির- ঠাকুরমান্দা।
  • জগদ্দল বিহার
  • দিব্যক জয়স্তম্ভ
  • পতিসরː রবি ঠাকুরের কুঠি বাড়ী
  • ভীমের পানটি
  • আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান
  • শালবন
  • জবই বিল
  • মাহীসন্তোষের মাজার
  • দিবরের দীঘি
  • হলুদ বিহার

 

কৃতি ব্যক্তিত্ব

  • মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ – বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম ডেপুটি স্পীকার;
  • তালিম হোসেন (১৯১৮ – ১৯৯৯) কবি ও গবেষক;
  • শিশির নাগ (১৯৩৬ – ৭ জুলাই ১৯৬০) – সাংবাদিক, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক এবং বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী।
  • জেমস – সঙ্গীত শিল্পী;
  • আব্দুল জলিল – রাজনীতিবিদ;
  • আখতার হামিদ সিদ্দিকী – বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার।
  • সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী – বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সচিব
  • সাধন চন্দ্র মজুমদার – মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী
  • মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক – সাবেক পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী
  • মতিন রহমান – চলচ্চিত্র পরিচালক

 

কিভাবে যাবেন

সড়ক পথে- ঢাকার গাবতলী এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে নওগাঁ যাবার জন্য এসি-ননএসি বাস আছে। এর মধ্যে এসআর পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শাহ ফতেহ আলী পরিবহন উল্লেখযোগ্য।

  • শ্যামলী পরিবহন, ☎ ০২-৯০০৩৩৩১, ০২-৭৫২০৪০৫
  • এসআর ট্রাভেলস, ☎ ০২-৮০১৩৭৯৩, ০২-৮০৬০৮৭৬
  • শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, ☎ ০১৭১১০২০৬২৬
  • হানিফ এন্টারপ্রাইজ

রেল

নওগাঁ সদরের সাথে সরাসরি কোন রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। তবে নওগাঁ শহরের অদূরেই শান্তাহার রেল জংশন অবস্থিত। শান্তাহার পর্যন্ত রেলে গিয়ে, সেখান থেকে খুব সহজেই অটো রিকশা বা অন্য কোন বাহনে যাওয়া যায়। শান্তাহার থেকে নওগাঁ শহরের দূরত্ব প্রায় ৭ কিঃ মিঃ। ঢাকা থেকে শান্তাহার প্রতিদিন ৫ টি রেলগাড়ি যাওয়া আসা করে। ট্রেনের সময়সূচীঃ

ট্রেন নং নাম বন্ধের দিন হইতে ছাড়ে গন্তব্য
৭০৫ একতা এক্সপ্রেস মঙ্গলবার ঢাকা ১০০০ দিনাজপুর
৭৫১ লালমনি এক্সপ্রেস শুক্রবার ঢাকা ২২১০ লালমনিরহাট
৭৫৭ দ্রুতযান এক্সপ্রেস বুধবার ঢাকা ২০০০ দিনাজপুর
৭৬৫ নীলসাগর এক্সপ্রেস সোমবার ঢাকা ০৮০০ চিলাহাটি
৭৭১ রংপুর এক্সপ্রেস রবিবার ঢাকা ০৯০০ রংপুর

 

আকাশ পথে- নওগাঁ হতে প্রায় ৭০ কিঃমিঃ উত্তরে রাজশাহীতে ‘শাহ মখদুম বিমানবন্দর’ অবস্থিত। এখানে রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী রুটে উড়োজাহাজ চলাচল করে। রাজশাহী থেকে বাস যোগে নওগাঁ যেতে প্রায় ২ ঘন্টা সময় লাগে।

খাবার

নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী ‘প্যারা’ সন্দেশের সুখ্যাতি এখন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। শুরুতে পূজা মণ্ডপের দেব-দেবীর উপাসনার উদ্দেশে এই সন্দেশ তৈরি করা হলেও সময়ের স্রোতে এখন তা অতিথি আপ্যায়ন, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে পাঠানো বা নিয়ে যাওয়া মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রতি কেজি সন্দেসের মূল্য ৩০০ টাকা। নওগাঁর এই ঐতিহ্যবাহী সন্দেশ এখন দেশের বাইরেও বেশ সুনাম অর্জন করছে।

 

 

 

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!