সোনালী নওগাঁ

Back to Posts

সোনালী নওগাঁ

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বৈচিত্রের দিক দিয়ে নওগাঁ জেলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। উত্তরবঙ্গের এ জেলায় কোন বড় বড় শিল্প কারখানা না থাকলেও রয়েছে শতশত বছরের পুরাতন দর্শনীয় স্থান। লালমাটির এই অঞ্চলে যেকোনো সময়ই যেতে পারেন। প্রাচীন ইতিহাস, সভ্যতা ও স্থাপত্যের প্রতি যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্য নওগাঁ জেলা বেছে নেওয়াটা হবে সবচেয়ে ভাল। বরেন্দ্রের উচুঁ-ঢালু লালমাটির পথ ধরে চলতে চলতে দেখা মিলবে মৌর্য, গুপ্ত ও পাল থেকে শুরু করে সুলতানী বা মুঘল আমলের প্রত্নস্থান। সন্ধ্যায় দূরের কোন সাঁওতালপল্লী থেকে ভেসে আসবে সারাদিনের ক্লান্তি জুড়ানোর আদিবাসীদের গান। প্রাচীন নির্দশন ও দর্শনীয় স্থানে ভরা এই নওগাঁ জেলা। নওগাঁ শুধু ভ্রমণের জন্য অন্যতম নয় নওগাঁর রসমালাই,বিশেষ করে “প্যারা সন্দেশ” খেতে অবশ্যই ভূলবেন না। যেগুলোর স্বাদ আপনার মুখে দীর্ঘদিন থাকবে।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ভাগে, বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক সীমারেখা সংলগ্ন যে ভূখন্ডটি ১৯৮৪-র পহেলা মার্চের পূর্ব পর্যন্ত নওগাঁ মহকুমা হিসেবে গণ্য হত, তাই হয়েছে এখন বাংলাদেশের কণ্ঠশোভা নওগাঁ জেলা। ভূমির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে নওগাঁ কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ক) বরেন্দ্র অঞ্চল, খ) বিল বা ভর অঞ্চল এবং গ) পলি অঞ্চল।

নওগাঁর উত্তরে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর, দক্ষিণে বাংলাদেশের নাটোর ও রাজশাহী জেলা, পূর্বে জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের মালদহ ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। এ জেলায় সাওতাল, উরাও, মুন্ডা, সুরিয়া পাহাড়ি, মাহালি, বাঁশফোড়, কুরমি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টীদের বসবাস আছে।

নওগাঁ জেলায় উন্নীত হয়ঃ ১ মার্চ, ১৯৮৪ খ্রিঃ আয়তনঃ ৩,৪৩৫.৬৭ বঃকিঃ (১,৩২৬.৫২ বঃমাঃ)। লোক সংখ্যাঃ ২৩,৮৫,৯০০ জন ( পুরুষ-১২,৩০,০০০ জন এবং মহিলা-১১,৫৫,৯০০জন)। উপজেলা- ১১ টি। পৌর সভা ০৩ টি। ইউনিয়ন- ৯৯টি। গ্রাম- ২৮৫৪টি। উপজেলাগুলো হচ্ছে- পত্নীতলা, ধামইরহাট, মহাদেবপুর, পোরশা, সাপাহার, বদলগাছী, মান্দা, নিয়ামতপুর, আত্রাই, রাণীনগর ও নওগাঁ সদর উপজেলা।

নওগাঁ জেলার পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত পুনর্ভবা, মধ্যবর্তী আত্রাই এবং পূর্বভাগে যমুনা এই জেলার প্রধান নদী। যমুনাও মূলত তিস্তা নদীরই একটি শাখা। প্রধান নদী: আত্রাই, পুনর্ভবা, ছোট যমুনা, নাগর, শিব; চলন বিল উল্লেখযোগ্য।

লোকসংস্কৃতি সঙ্গীত: পল্লীগীতি, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া ও মেয়েলী গান উল্লেখযোগ্য। উৎসব: বাংলা নববর্ষ, চড়কপূজা, নবান্ন, হালখাতা, বেরাভাসন, পহেলা বৈশাখ উল্লেখযোগ্য। খেলাধূলা: হা-ডু-ডু, নৌকাবাইচ, দাড়িয়াবান্ধা, লাঠিখেলা উল্লেখযোগ্য।

 

দর্শনীয় স্থান

  • পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার
  • কুসুম্বা মসজিদ
  • বলিহার রাজবাড়ী
  • ভবানীপুর জমিদার বাড়ি
  • রঘুনাথ মন্দির- ঠাকুরমান্দা।
  • জগদ্দল বিহার
  • দিব্যক জয়স্তম্ভ
  • পতিসরː রবি ঠাকুরের কুঠি বাড়ী
  • ভীমের পানটি
  • আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান
  • শালবন
  • জবই বিল
  • মাহীসন্তোষের মাজার
  • দিবরের দীঘি
  • হলুদ বিহার
  • নিয়ামতপুরে সারিবদ্ধ শত শত তাল গাছঃ কালের বিবর্তনে তালগাছ হারিয়ে গেলেও নওগাঁর নিয়ামতপুরে এখন কালের সাক্ষী হয়ে শত শত তালগাছের সারি রাস্তার দুই ধারে সৌন্দর্যবর্ধন করে যাচ্ছে। উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম ‘ঘুঘুডাঙ্গা’। হাজিনগর গ্রাম থেকে ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে যাওয়ার পথে হাজিনগরের মজুমদার মোড় থেকে ঘুঘুডাঙ্গা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তার দুই ধারে প্রায় ছয়শ’ তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন ৫০ থেকে একশ’ জন বৃক্ষপ্রেমী ও ভ্রমণ পিয়াসী আসেন এই তালগাছ দেখতে।

 

কৃতি ব্যক্তিত্ব

  • মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ – বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম ডেপুটি স্পীকার;
  • তালিম হোসেন (১৯১৮ – ১৯৯৯) কবি ও গবেষক;
  • শিশির নাগ (১৯৩৬ – ৭ জুলাই ১৯৬০) – সাংবাদিক, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক এবং বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী।
  • জেমস – সঙ্গীত শিল্পী;
  • আব্দুল জলিল – রাজনীতিবিদ;
  • আখতার হামিদ সিদ্দিকী – বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার।
  • সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী – বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সচিব
  • সাধন চন্দ্র মজুমদার – মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী
  • মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক – সাবেক পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী
  • মতিন রহমান – চলচ্চিত্র পরিচালক

 

কিভাবে যাবেন

সড়ক পথে- ঢাকার গাবতলী এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে নওগাঁ যাবার জন্য এসি-ননএসি বাস আছে। এর মধ্যে এসআর পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শাহ ফতেহ আলী পরিবহন উল্লেখযোগ্য।

  • শ্যামলী পরিবহন, ☎ ০২-৯০০৩৩৩১, ০২-৭৫২০৪০৫
  • এসআর ট্রাভেলস, ☎ ০২-৮০১৩৭৯৩, ০২-৮০৬০৮৭৬
  • শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, ☎ ০১৭১১০২০৬২৬
  • হানিফ এন্টারপ্রাইজ

রেল

নওগাঁ সদরের সাথে সরাসরি কোন রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। তবে নওগাঁ শহরের অদূরেই শান্তাহার রেল জংশন অবস্থিত। শান্তাহার পর্যন্ত রেলে গিয়ে, সেখান থেকে খুব সহজেই অটো রিকশা বা অন্য কোন বাহনে যাওয়া যায়। শান্তাহার থেকে নওগাঁ শহরের দূরত্ব প্রায় ৭ কিঃ মিঃ। ঢাকা থেকে শান্তাহার প্রতিদিন ৫ টি রেলগাড়ি যাওয়া আসা করে। ট্রেনের সময়সূচীঃ

ট্রেন নংনামবন্ধের দিনহইতেছাড়েগন্তব্য
৭০৫একতা এক্সপ্রেসমঙ্গলবারঢাকা১০০০দিনাজপুর
৭৫১লালমনি এক্সপ্রেসশুক্রবারঢাকা২২১০লালমনিরহাট
৭৫৭দ্রুতযান এক্সপ্রেসবুধবারঢাকা২০০০দিনাজপুর
৭৬৫নীলসাগর এক্সপ্রেসসোমবারঢাকা০৮০০চিলাহাটি
৭৭১রংপুর এক্সপ্রেসরবিবারঢাকা০৯০০রংপুর

 

আকাশ পথে- নওগাঁ হতে প্রায় ৭০ কিঃমিঃ উত্তরে রাজশাহীতে ‘শাহ মখদুম বিমানবন্দর’ অবস্থিত। এখানে রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী রুটে উড়োজাহাজ চলাচল করে। রাজশাহী থেকে বাস যোগে নওগাঁ যেতে প্রায় ২ ঘন্টা সময় লাগে।

খাবার

নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী ‘প্যারা’ সন্দেশের সুখ্যাতি এখন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। শুরুতে পূজা মণ্ডপের দেব-দেবীর উপাসনার উদ্দেশে এই সন্দেশ তৈরি করা হলেও সময়ের স্রোতে এখন তা অতিথি আপ্যায়ন, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে পাঠানো বা নিয়ে যাওয়া মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রতি কেজি সন্দেসের মূল্য ৩০০ টাকা। নওগাঁর এই ঐতিহ্যবাহী সন্দেশ এখন দেশের বাইরেও বেশ সুনাম অর্জন করছে। 

কুসুম্বা মসজিদঃ নওগাঁ সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত দেশের উল্লেখযোগ্য প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন এই কুসুম্বা মসজিদ। বাংলাদেশের পাঁচ টাকার নোটে মুদ্রিত ছবিটি নওগাঁর ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদের। ১৫৫৮ সালে জনৈক সোলায়মান মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৪৬০ বছরের প্রাচীন পাথরের নির্মিত মসজিদটি ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট। ১৮৮৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৬৪ সালে মসজিদটি শেষবারের মতো সংস্কার করা হয়। ১৮৯৮ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটির একটি গম্বুজ ধসে পড়ে। ১৯৬৪ সালে সেই গম্বুজটি পুনরায় নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৫০ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুসুম্বা মসজিদ অধিগ্রহণ করে। নওগাঁ থেকে অনায়াসে বাসে আসা যায় এখানে।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারঃ বিশ্ব ঐতিহ্য নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার প্রায় ৬৮ একর জমির ওপর অবস্থিত পাহাড়পুর বিহার বা সোমপুর বিহার। এ অঞ্চলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতœস্থানটির নাম হলো পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। মহাবিহারটি পাল বংশীয় দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ খ্রিঃ) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের বিখ্যাত ধর্মচর্চা কেন্দ্র ছিল। এটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ৩২২তম হিসেবে স্থান পায়। যুগযুগ ধরে ধ্বংসাবশেষে ধুলাবালি জমে এক বিশালা উঁচু ঢিবিতে পরিণত হয়েছে। সম্ভবত এভাবেই স্থানের নাম হয় পাহাড়পুর। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কারের পর ১৯২৩ হতে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সময়ের খননের ফলে বিভিন্ন প্রস্তর লিপি, ভাস্কর্য,পোড়ামাটির ফলক, ইট, বিভিন্ন ধাতব দ্রবাদি, রৌপ্যমুদ্রা, মাটির বিভিন্ন পাত্রসহ প্রচুর প্রতœ নিদশর্ন পাওয়া যায় যা বর্তমানে বিহারের যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। লিপিযুক্ত মাটির সিলের পাঠোদ্ধার হতে জানা যায়,বিহারের প্রকৃত নাম ছিল সোমপুর মহাবিহার। বিহারের উত্তর দিকে মূল প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব ও পশ্চিমে ৯১৯ ফুট বিস্তৃত। এই বিহারের চারদিকে ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৩ ফুট প্রস্থের ১৭৭টি ভিক্ষু কক্ষ উত্কীর্ণ হয়েছে। বিহারের আঙ্গিনার কেন্দ্রস্থলে ক্রমাকৃতি ও ধাপে ধাপে নির্মিত একটি সুউচ্চ মন্দির রয়েছে। নবম শতাব্দীর শেষে কতিপয় বিদেশি রাজাগণ কর্তৃক পাল সাম্রাজ্য বারবার আক্রান্ত হয়। এভাবে পুনঃ পুনঃ আক্রমণের ফলে সোমপুর বিহার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।নওগাঁ মূল শহর থেকে উত্তর দিকে ৩৪ কিলোমিটার দূরে বদলগাছি উপজেলায় অবস্থিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যটি। বিহারটির পাশে রাত্রি যাপনের জন্য নেই কোন ভালো আবাসিকের ব্যবস্থা। পিকনিক স্পটের জন্য রয়েছে মনোরম পরিবেশ। নওগাঁ শহরের বালুডাঙ্গা বাস স্টেশন থেকে সিএনজি, অটোরিকশা ও বাসযোগে খুব সহজেই যাওয়া যায় পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে।

জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারঃ নওগাঁ জেলা সদর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে ধামইরহাটে অবস্থিত একটি প্রাচীন স্থান। স্থানীয়রা এটিকে বটকৃষ্ণ জমিদার বাড়িও বলে থাকে এবং জায়গাটিকে জজ্ঞদল হিসেবেও বলা হয়ে থাকে। বর্তমান উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রতে (১১শ শতাব্দীর শেষ থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে) এটি ছিল একটি বৌদ্ধ বিহার এবং শিক্ষাদান কেন্দ্র। পাল রাজবংশের রাজা সম্ভবত রামপাল (১০৭৭-১১২০) পাল শাসনামলের শেষার্ধে এটি প্রতিষ্ঠা করেন উত্তরপশ্চিম বাংলাদেশে অবস্থিত ধামইরহাট উপজেলার জাগদ্দল গ্রামে যে জায়গাটি ভারত সীমান্তবর্তী এবং পাহাড়পুরের নিকটে অবস্থিত। উত্তর-পূর্ব ভারতে পাল শাসনামলের চার শতকে (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৬-১১৭৪) প্রাচীন বাংলা এবং মাগাধাতে অনেক বিহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ধর্মপাল (৭৮১-৮২১) একাই ৫০টি বিহার প্রতিষ্ঠা করেন যার মধ্যে ছিল সে সময়ের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রমশীলা। তিব্বতের সূত্র অনুযায়ী পাঁচটি শ্রেষ্ঠ মহাবিহার ছিলঃ বিক্রমশীলা ছিল সেই যুগের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়; নালান্দা; সোমপুর মহাবিহার; অদন্তপুর এবং জাজ্ঞাদলা। পাল আমলে পূর্ব ভারতে শিক্ষাদানকারী সবগুলো বৌদ্ধবিহার রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ছিল এবং বৌদ্ধবিহারগুলো একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল এবং বিহারগুলোর মধ্যে সমন্বয় ছিল এতে করে মহান মনিষীদের জন্য বৌদ্ধবিহারগুলোর মধ্যে অবস্থান বদলানো সহজ হত। বজ্রানা বৌদ্ধশাস্ত্রে বিশেষায়িত ছিল জগদ্দল। পরবর্তীকালে জানা যায় যে কানজুর এবং তেংজুরে উল্লেখিত প্রচুর অক্ষর এই জগদ্দলেই গঠন করা হয়েছিল। সম্ভবত সাংস্কত ভাষার প্রাচীনতম সংকলন সুভাসিতারতœকোষ জগদ্দলেই ১১শ শতাব্দীর শেষের দিকে অথবা ১২শ শতাব্দীর শুরুতে গঠন করা হয়।জেলা সদর হতে দূরত্ব ৫৪ কিঃ মিঃ। সড়কপথে যেকোন যানবাহনে যাওয়া যায়।

বিশ্বকবির পতিসর কাছারি  বাড়িঃ ‘আমাদের ছোট ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে,বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে’- এই কবিতাটি বিশ্বকবি পতিসরে তার কাছারি  বাড়িতে এসে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকা-বাঁকা আত্রাই নদীকে নিয়ে লিখেছিলেন। প্রায় এক বিঘা জমির ওপর অবস্থিত কবির এই দোতলা কাছারি বাড়ি। পতিসরের এই কাছারি বাড়িটি অনেকটাই শিলাইদহ ও শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ির অনুরুপ। এখানে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কবির ব্যবহূত বিভিন্ন আসবাবপত্র। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বকবির পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এই কালিগ্রাম পরগনাকে ক্রয় করে ঠাকুর পরিবারের জমিদারীর অংশে অর্ন্তভুক্ত করেন। এরপর বিশ্বকবি ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি পতিসরের কাছারি বাড়িতে জমিদারী দেখাশোনা ও খাজনা আদায় করতে আসেন। সর্বশেষ ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কবি এখানে শেষবারের মতো এসেছিলেন। নওগাঁ শহর থেকে পতিসরের দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটার এবং আত্রাই হতে ৪৬ কিলোমিটার। নওগাঁ জেলা সদর ও আত্রাইয়ের স্টেশন হতে মাইক্রোবাস, বাস,সিএনজিযোগে পতিসরে যাওয়া যায়।

দিবর দীঘি ও  দিব্যক বিজয়স্তম্ভঃ নওগাঁ জেলার পতিœতলা উপজেলায় অবস্থিত দিবর দীঘি। এই দীঘির মাঝখানে আছে দিব্যক বিজয় স্তম্ভ। দ্বাদশ শতকে পাল শাসক দ্বিতীয় মহীপালকে যুদ্ধে পরাজিত করে কৈবর্ত রাজা দিব্যক বিজয়ের নিদর্শন হিসেবে এই দীঘি খনন করে এর মাঝখানে বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেন। পাথরের তৈরি স্তম্ভটির উচ্চতা ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। পানির নিচের অংশ ২৫ ফুট ৫ইঞ্চি। দীঘির মাঝখানে আজো অক্ষত অবস্থায় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে দিবর দীঘির বিজয়স্তম্ভ।

আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যানঃ নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা একটি দিঘীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সুবিশাল বনভূমি। শালবন এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ২৬৪ হেক্টর জমির এই বনভূমির ডাশ মাঝখানেই রয়েছে প্রায় ৪৩ একর আয়তনের একটি বিশাল দিঘী, যা ‘আলতাদিঘী’ নামে পরিচিত। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে একে ‘আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান’ হিসাবে ঘোষণা করেছে। আনুমানিক ১৪০০ সালে এ অঞ্চলে রাজা বিশ্বনাথ জগদল রাজত্ব করতেন। আবহমান কাল থেকেই রুক্ষ এই বরেন্দ অঞ্চলে পানির অভাব ছিল এবং রাজা বিশ্বনাথের রাজত্বকালে এই পানির অভাব প্রকট হয়। মাঠ ঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়ায় আবাদি জমিতে ফসল ফলানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে। হঠাৎ একদিন রাণী স্বপ্নে দেখলেন, পানি সমস্যা সমাধানে এলাকায় একটি দিঘী খনন করতে হবে। সে অনুযায়ী রাণী রাজাকে বললেন,যতক্ষণ পর্যন্ত না পা ফেটে রক্ত বের হবে ততক্ষণ তিনি হাঁটতে থাকবেন এবং যেখানে গিয়ে পা ফেটে রক্ত বের হবে ততদূর পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিতে হবে। পাইক পেয়াদা, লোক লস্করসহ রাণী হাঁটা শুরু করলেন। অনেক দূর হাঁটার পর রাণী যখন থামছিলেন না, তখন পাইক-পেয়াদারা ভাবলেন এত বড় দিঘী খনন করা রাজার পক্ষে সম্ভব হবে না, সে কারণে তাদের একজন রাণীর পায়ে আলতা ঢেলে দিয়ে চিৎকার করে বললেন, রাণী মা আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। একথা শুনে রাণী সেখানেই বসে পড়লেন। রাজা বিশ্বনাথ ওই স্থান পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিলেন। এরপর অলৌকিকভাবে মুহূর্তেই বিশুদ্ধ পানিতে ভরে ওঠে দিঘী। রাণীর পায়ে আলতা ঢেলে দেয়ার প্রেক্ষিতে দিঘীটির নামকরণ করা হয় আলতাদিঘী। দিঘীটির দৈর্ঘ্য ১.২০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ০.২০ কিলোমিটার। আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, পোকামাকড় সহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র রয়েছে। বিশেষত শালগাছকে আলিঙ্গণ করে গড়ে ওঠা উঁই পোকার ঢিবিগুলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। জেলা সদর হতে দূরত্ব ৫৬ কিঃ মিঃ। সড়কপথে যেকোন যানবাহনে যাওয়া যায় ।

নওগাঁ যেভাবে আসবেনঃ ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি নওগাঁ যাওয়া যায়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই পথের বাসগুলো ছাড়ে। শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ডিপজল এন্টারপ্রাইজ,এসআর পরিবহন, কেয়া পরিবহন, টিআর এন্টারপ্রাইজ, মৌ এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার এসি-নন এসি বাস চলে। তাছাড়া রেলপথে আসতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর অথবা ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন একতা, নীলসাগর এক্সপ্রেস দ্রুতযান,লালমনি ও রংপুর এক্সপ্রেসে এসে সান্তাহার জংশন স্টেশনে নামতে হবে। সান্তাহার থেকে রিকশা, অটোরিকশা ও সিএনজি করে খুবই অল্প সময়ে নওগাঁয় আসা যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে নওগাঁ আসে শ্যামলী পরিবহন।

নওগাঁ ভ্রমনে এসে কোথায় থাকবেনঃ নওগাঁ ও সান্তাহার শহরে থাকার জন্য সাধারণ মানের কিছু আবাসিক হোটেল আছে। নওগাঁয় এরকম কয়েকটি হোটেল হলো-হোটেল ফারিয়াল,হোটেল অবকাশ, হোটেল রাজ, হোটেল যমুনা, হোটেল প্লাবণ, মুক্তির মোড়ে হোটেল আগমনী, হোটেল সরণি ও মোটেল চিসতী।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!