তাঁতশিল্পের মেলা- নরসিংদী জেলা

তাঁতশিল্পের মেলা- নরসিংদী জেলা

মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়ালখাঁ ও পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর তীর বিধৌত প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যে লালিত জেলাটির নাম নরসিংদী। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবস্থানগত কারণে এ জেলা কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে এক সমৃদ্ধ জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নরসিংদী মূলত প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং লটকন ফল চাষের জন্য বাংলাদেশে সুবিখ্যাত। প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো মূলত তারই প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি জেলার বেলাব উপজেলাধীন উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় অসমরাজার গড় নামক স্থানে প্রায় তিন হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেছে।

এ জেলার রয়েছে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ঢাকার বাইরে প্রথম হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে এ জেলার পাঁচদোনা নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবলভাবে প্রতিরোধ করে এবং শুরু হয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধে  হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর একটি সাজোয়া যান ধ্বংস হয়,হতাহত হয় বেশ কিছু পাকিস্তানী সৈন্য। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুথ্থানের নায়ক শহীদ ‌‌আসাদ, মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব প্রাপ্ত ফ্লাইট লে: মতিউর রহমান, বরন্যে কবি সামসুর রহমান, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক ড.আলাউদ্দিন আল আজাদ, পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশ চন্দ্র সেন এ জেলারই সন্তান।

নরসিংদী সদর, শিবপুর, পলাশ, মনোহরদী, রায়পুরা ও বেলাব উপজেলা এই ৬টি উপজেলা নিয়ে নরসিংদী জেলা। নরসিংদীর উত্তরে কিশোরগঞ্জ, পূর্বে ব্রাহ্মনবাড়িয়া, দক্ষিণে নারায়নগঞ্জ ও ব্রাহ্মনবাড়িয়া এবং পশ্চিমে গাজীপুর পরিবেষ্টিত। আয়তন ৩,৩৬০.৫৯ বর্গ কি:মি:, জনসংখ্যা ২২,২৪,৯৪৪ জন (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী), উপজেলা ৬ টি, পৌরসভার ৬ টি, ইউনিয়ন ৭১ টি, গ্রাম ১০৯৫ টি। রাজধানী ঢাকা থেকে দূরত্ব সড়ক পথে ৫৭ কি:মি:, রেলপথে ৫৫ কি:মিঃ।

 

চিত্তাকর্ষক স্থানসমূহ

  • উয়ারী-বটেশ্বর – বেলাব উপজেলার অমলাব ইউনিয়ন;
  • হ্যারিটেজ রিসোর্ট, মাধবধী;  পার্ক,
  • ড্রীম হলিডে পার্ক- পাচদোনা
  • বালাপুর জমিদার বাড়ি
  • লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি
  • সিধেন সাহার জমিদার বাড়ি
  • সুদান সাহার জমিদার বাড়ি
  • মনু মিয়ার জমিদার বাড়ি (ঘোড়াশাল জমিদার বাড়ি)
  • চরসিন্দুর ব্রিজ
  • সোনাইমুড়ি টেক – শিবপুর উপজেলা;
  • বেলাব জামে মসজিদ
  • পারুলিয়ার ঐতিহাসিক পারুলিয়া মসজিদ
  • বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্মৃতি জাদুঘর – রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রাম;
  • ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাস্তুভিটা পাঁচদোনা বাজার সংলগ্ল বুড়ারহাট গ্রাম।
  • আশরিনগর মিনি পার্ক -নরসিংদী রেল স্টেশনের সাথেই।
  • ঘোড়াশাল দোতলা রেলওয়ে স্টেশন (যা বাংলাদেশের প্রথম দ্বিতলবিশিষ্ট রেলওয়ে স্টেশন)
  • মঠ
  • লক্ষণ সাহার বাড়ি, সুদান সাহার বাড়ি ও আশেপাশের অন্যান্য বাড়িগুলোর কারুকাজ অত্যন্ত সুনিপুন নির্মানশৈলীতে তৈরী।নিখুঁত সুন্দর্যের এই ভবনগুলো শত বছর পরও ঐতিহ্যপ্রেমী ও ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের মুগ্ধ করে তোলে।
  • উকিল বাড়ি নামে পরিচিত নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাংগা বাজার থেকে মাত্র ১০ মিনিট এর দূরত্বে অবস্থিত লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি। মোঘল আমলে নির্মিত কারুকার্যখচিত অনন্য সাধারণ এই জমিদার বাড়ির মালিকানায় আছে একজন উকিল জনাব আহাম্মদ আলি।
  • আরও আছে অর্ধনির্মিত প্রাচীন বাড়ি। চারিদিকে শুধুই নিরবতা। হু হু করে বয়ে যায় দক্ষিণা বাতাস। যেখানে এক সময় বাড়িটির ভেতরে ও সামনে ছিল বিশাল আকারের ফুলের বাগান। পাখির কলকাকলী মধুর গান মনকে দোলা দিয়ে ওঠে। অসাধারণ ২তলা বিশিষ্ট বাড়িটি মূলত এর নকশার জন্যই। 
  • ইতিহাসের পাতায় নাম লিখে আছে। মোট ২৪ কক্ষের এই ২তলা জমিদার বাড়িতে আছে ২টি খুব সুন্দর কারুকার্যখচিত বেলকোনি, লম্বা কিরিডোর, বাধানো ছাদ। খেলামেলা এই ছাদে অনেকটা চিলেকোঠার স্বাদ পাওয়া যায়। বাড়ির পিছনে আছে বিশাল গাছের বাগান।
  • জমিদার বাড়িসহ এই বাগানের চারিদিক উঁচু প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত। পুরো জমিদার বাড়ির সামনে ও পিছনে শুধুই সবুজ ঘাসের আনাগোনা। দেখলেই চোখ তৃপ্তিতে ভোরে ওঠে। পুরাতন এই জমিদার বাড়িগুলোর প্রাচীন ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ন প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন বহন করে আসছে।
  • লক্ষণ সেনের জমিদার বাড়ির খুব কাছেই আরও একটি কারুকার্যময় পুরানা সুদান সাহার বাড়ি। এর কারুকাজ দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে। এর সামনে আছে আরও একটি পুকুর। বর্তমানে এর খনন কাজ চলছে। পুকুরের পাশেই আছে শান বাধানো ঘাট ও সামনে খেলা জায়গা।
  • এর অল্প কিছু দূরে পাবেন আরেকটি পুরানো বাড়ি। এটি পরিচিত কুনডু সাহার বাড়ি নামে।বাড়িটি বর্তমানে পরিত্যক্ত কিন্তু আয়তনে লক্ষণ ও সুদান এর বাড়ির তুলনায় অনেক বড়।
  • চাইলে মেঘনা নদীতে নৌকা ভ্রমণ করে আনন্দটুকুর পরিসীমা আরও দৃঢ় করতে পারেন। মেঘনার সচ্ছ পানির কলকল শব্দে সবাই মাতোহারা ও মরিয়া হয়ে ওঠে।

নরসিংদী জেলার একটি বিশেষ এবং উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য হচ্ছে তাঁত শিল্প। ‘প্রাচ্যের ম্যানচেষ্টার’ বলে খ্যাত শেখেরচর (বাবুরহাট) এ জেলায় অবস্থিত। বাংলাদেশের তাঁত বস্ত্রের চাহিদার প্রায় সিংহভাগ পূরণ করছে এ জেলার তাঁত শিল্প। কলা, কাঁকরোল, শশা, সিম,বেগুন ,ধান, পাট, আলু ও লটকন উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য নরসিংদী বাংলাদেশের একটি অন্যতম কৃষি সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত হয়েছে। প্রদান নদী- মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়ালখাঁ ও পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র। লোকসংস্কৃতি- দিপান্বিতা, ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া (ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় প্রতি বছর কার্তিকের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে বোনেরা ভাইদের কপালে চন্দন ও কাজলের ফোঁটা দেয়), পুণ্যাহ, জামাই ষষ্ঠী উল্লেখযোগ্য।

 

খাবার

নামসাগর কলা, লটকন ও লেবুর জন্য বিখ্যাত নরসিংদী।

 

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

  • বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান
  • আফসার উদ্দিন সরকার , বর্তমান নরসিংদী পৌরসভার জনক ও প্রথম চেয়াম্যান, নরসিংদী পৌরসভা
  • কবি দ্বিজদাস,
  • কবি শামসুর রাহমান,
  • ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ (৬ মে, ১৯৩২ – ৩ জুলাই, ২০০৯) সাহিত্যিক
  • ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন – অনুবাদক।
  • সতীশচন্দ্র পাকড়াশী (১৮৯৩-৩০ ডিসেম্বর, ১৯৭৩) বাঙালী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সশস্ত্র বিপ্লবী।
  • মিঞা মোঃ সুন্দর আলী গান্ধী সমাজ সংস্কারক অবিভক্ত বাংলার কৃষক-প্রজা পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বিদ্যুৎসাহী ও নরসিংদীর সিংহপুরুষ
  • মুসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া,প্রথম সংসদ সদস্য, নরসিংদী সদর।
  • আপেল মাহমুদ,
  • স্যার কে,জি,গুপ্ত,
  • সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান মো: নূরউদ্দিন খান।
  • জনাব সাদত আলী সরকার,,ব্রিটিশ আমলে নরসিংদী জেলার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন।
  • জনাব কাশেম আলী সরকার (টেলু মিয়া),পাকিস্তান আমলে নরসিংদী জেলার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি,এবং ততকালিন সময় সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সর্ব বৃহৎ তালিকা ভুক্ত ধান ও চাউলের ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক জন ছিলেন।
  • প্রফেসর ড.রসিদ উদ্দিন আহমদ- উপমহাদেশের অন্যতম নিউরোসার্জন এবং বাংলাদেশের প্রথম নিউরোসার্জন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] নরসিংদী,আমদিয়া ইউনিয়নের বেলাব গ্রাম। ২০১৬ ইংরেজি সনের মার্চের উনিশ তারিখ ইন্তেকাল করেন।
  • অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ এম.এসসি সাহেব (যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ-ভারতে বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত হন। এবং অজপাড়া গায়ে তিনি স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।বহু দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম কিছু স্থান হচ্ছে

 

যেভাবে যাবেন

ঢাকার গুলিস্তান, সায়েদাবাদ ও মহাখালী থেকে নরসিংদীর সরাসরি বাস আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে বামে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে একটু এগুলেই নরসিংদী।  ঢাকা থেকে নরসিংদীর দূরত্ব মাত্র ৫৪ কিলোমিটার। গুলিস্তান, সায়েদাবাদ ও আব্দুল্লাহপুর থেকে নরসিংদীর বাস পাওয়া যায়। বিভিন্ন পরিবহন ৫ মিনিট পর পর নরসিংদী যাচ্ছে। যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। ভাড়া ৬০ টাকার  মতো। ট্রেনেও নরসিংদী যেতে পারবেন।

  • পি পি এল সুপার
  • অনন্যা সুপার
  • মেঘালয় পরিবহন
  • বি আর টি সি
  • মনোহরদি পরিবহন

এই সব বাস এ করে খুব সহজে চলে আসতে পারেন নরসিংদীতে। ভাড়া মাত্র ১০০ টাকা করে নিবে।

রেলপথে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে নরসিংদী যেতে ট্রেনে সময় লাগে ১ ঘণ্টার মতো, ভাড়া ৩০ টাকা। ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটে চলাচল করে ৭৩৮/৭৩৭ নং এগারোসিন্ধুর প্রভাতী আন্ত:নগর ট্রেনটি।

 

রাত্রীযাপন

নরসিংদী সকালে এসে ঘুরেফিরে রাতে ফেরত যেতে পারবেন। শহরে থাকা-খাওয়ার বেশ কয়েকটি ভালো হোটেল আছে, আছে নরসিংদী শহরে ডাকবাংলোও, সার্কিট হাউজ। 

 

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!