কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ – ভোলা

কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ – ভোলা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য “কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ” উপাধি প্রাপ্ত ভোলা জেলা বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ জেলা। ভোলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এর পূর্বের নাম দক্ষিণ শাহবাজপুর। ভোলা দেশের একমাত্র জেলা যে জেলার কোনো আঞ্চলিক ভাষা নেই। ভোলার মানুষ সব ধরনের ভাষায় সহজেই কথা বলতে পারে। ভোলা’ই দেশের একমাত্র জেলা যে জেলার মানুষ সবচেয়ে অতিথি পরায়ণ। দেশের সিংহ ভাগ ইলিশের চাহিদা মেটাতে ভোলা থেকেই সরবরাহ করা হয় রুপালি ইলিশ,জাতীয় গ্রিডের ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ভোলা থেকেই। গ্রিডে নতুন সরবরাহ ২২৫ মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে ভোলায়। দেশের প্রায় অর্ধ ভাগ গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ভোলা থেকে ভোলার বিখ্যাত মহিষের দুধের টক দধি বিখ্যাত। সুপারি এবং মিষ্টির জন্য বিখ্যাত ভোলা। দক্ষিন এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওয়াচ টাওয়ার ভোলার দ্বীপে। নদী পথে শান্তির বাহন বিলাশবহুল লঞ্চ গুলো ভোলার মানুষের গর্ব।

ভোলা জেলার উত্তরে বরিশাল জেলা ও মেঘনা নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা ও মেঘনা নদী এবং পশ্চিমে বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা ও তেঁতুলিয়া নদী। মোট আয়তন ৩৪০৩.৪৮ বর্গকিলোমিটার। চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, ভোলা সদর, মনপুরা ও লালমোহন -এই সাতটি উপজেলার সমন্বয়ে ভোলা জেলা গঠিত।

ভোলা শহর ঢাকা থেকে নদী পথে দূরত্ব ১৯৫ কি.মি.। সড়কপথে বরিশাল হয়ে দূরত্ব ২৪৭ কি.মি. এবং লক্ষীপুর হয়ে দূরত্ব ২৪০কি.মি.। ভোলার সাথে অন্য কোন জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। অন্য জেলার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য ভোলাবাসীকে লঞ্চ, স্পিড বোট এবং ফেরীর উপর নির্ভর করতে হয়। দেশের দক্ষিনে বঙ্গপোসাগর এবং দেশের সর্ব বৃহৎ নদী মেঘনার কুল ঘেসে অবস্থিত একটি জেলা। যার সাথে কোনো জেলার সড়ক যোগাযোগ পথ নেই।

মনপুরা দ্বীপ, শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্র, শাহবাজপুর মেঘনা পর্যটন কেন্দ্র, তুলাতলী পর্যটন কেন্দ্র (ভোলা সদর), ফাতেমা খানম মসজিদ, চর কুকরী মুকরী, সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল পার্ক, শিশু পার্ক, জ্যাকব ওয়াচ টাওয়ার, চরফ্যাশন, তারুয়া সমূদ্র সৈকত, দুদু মিয়ার মাজার, বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্মৃতি যাদুঘর, নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশন মসজিদ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, খামার বাড়ি-নজরুল নগর, চরফ্যাশন, বিভাগীর টেক্সটাইল কলেজ, বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর জমিদার বাড়ি প্রভৃতি ভোলা জেলার দর্শনীয় স্থান।

বিখ্যাত ব্যক্তিত্বঃ মোস্তফা কামাল, কবি মোজাম্মেল হক, কবি নাসির আহমেদ, নলিনী দাস, মোহাম্মদ আবদুল মুহিত, শহিদ মোতাহার উদ্দিন মাস্টার, অধ্যক্ষ ফারুকুর রহমান, আন্দালিব রহমান, মেজর হাফিজ উদ্দিন (বীর বিক্রম), নাজিউর রহমান মন্জু (এমপি), তোফায়েল আহমেদ (এমপি), মরহুম মোশারফ হোসেন শাহজাহান (এমপি), আলহাজ্ব নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন (এমপি), আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব (এমপি), নাজিম উদ্দিন আলম (এমপি), আমিনুল হক, এ কেমকবুল আহমেদ, মোঃ হোসেন চৌধুরী, এডভোকেট ইউছুফ হোসেন হুমায়ুন, তৌসিফ (অভিনেতা), ডাঃ আজাহার উদ্দিন আহমদ, আজিজুদ্দিন আহমদ, আবদুল হাই চৌধুরী, এম. মোকাম্মেল হক, আলহাজ্ব হাফীজ ইব্রাহিম এমপি।

 

সাগর কন্যা মনপুরা 

ভোলা সদর থেকে একশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা দ্বীপ মনপুরার অবস্থান। প্রমত্তা মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে আসা পলি জমে এ দ্বীপের সৃষ্টি। সাগরের কোলে জন্ম নেওয়ায় স্থানীয়দের কাছে মনপুরা ‘সাগর কন্যা’ হিসেবে পরিচিত। এখানে ভোরে সূর্যের আগমনী বার্তা আর বিকেলে পশ্চিম আকাশে একটু একটু করে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অতুলনীয়। আবার রাতে দ্বীপের অন্য রূপ। ঘোমটা জড়ানো বধূর মতো নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায় পুরো দ্বীপ। প্রায় আটশ বছরের পুরনো মনপুরা উপজেলা বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চল তথা দেশজুড়ে পরিচিত একটি নাম।

মনপুরার ইতিহাস প্রাচীন। সাতশ বছর আগে এখানে পর্তুগীজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিল। যার প্রমাণ মেলে সেখানকার বড় লোমযুক্ত কুকুর দেখে। এখানকার পর্যটন সম্ভাবনা প্রচুর। পর্যটকদের কাছে মনপুরার আর্কষণীয় বিষয় হচ্ছে, এখানকার হাজার হাজার একর জায়গাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এ ছাড়াও রয়েছে বাহারী প্রজাতির বৃক্ষ, তরুলতা। আরো রয়েছে হরিণ, বানর, ভালুকসহ বিভিন্ন প্রাণী। গহীন জঙ্গলে ভয়ংকর কিছু প্রাণী রয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। মনপুরায় রয়েছে ৮ থেকে ১০টি বিচ্ছিন্ন চর। এগুলো চর তোজাম্মেল, চর পাতিলা, চর জামশেদ, চর পিয়াল, চর নিজাম, লালচর, বালুয়ার চর, চর গোয়ালিয়া, কলাতলির চর ও সাকুচিয়ার চর নামে পরিচিত। চরগুলো দেখলে মনে হবে কিশোরীর গলায় মুক্তার মালা। চরাঞ্চলে বন বিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজের বিপ্লব। চোখ ধাঁধানো রূপ নিয়েই যেন চরগুলোর জন্ম। চরগুলোতে রয়েছে মানুষের বসতি। যাদের জীবন যাত্রা কিছুটা ভিন্ন। জেলে, চাষী, দিনমজুর, কৃষক এবং খেয়া পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করে এখানকার বেশীর ভাগ মানুষ।

স্থানীয়দের দাবি, ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করার মতো ক্ষমতা রয়েছে সাগর কন্যার। শীত মৌসুমে এর চিত্র পাল্টে যায়। সাইবেরিয়া থেকে ছুটে আসা অতিথি পাখিদের আগমনে চরাঞ্চলে যেন নতুন প্রাণ জেগে ওঠে। তখন সাগর কন্যা মনপুরা অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। দেশের অন্যসব পর্যটন কেন্দ্রের তুলনায় মনপুরার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। মাইলের পর মাইল সবুজ বৃক্ষের সমাহার দেখে প্রথমে একে ঠিক চর মনে হবে না। যেন ক্যানভাসে আঁকা শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া। মনপুরায় নানান প্রজাতির গাছের সংখ্যা রয়েছে ৫ কোটিরও বেশি। রয়েছে একটি ল্যান্ডিং স্টেশন। সেখান থেকে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

কিভাবে যাওয়া যায়

ভোলা থেকে প্যথমে তজুমুদ্দিন সি ট্রাক ঘাটে যেতে হবে । সেখান তেকে বিকাল ৩.০০ টায় সি ট্রাক দিয়ে মনপুরায় যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা তেকে আসা লঞ্চেও মনপুরা যাওয়া যায়। অথবা দিনের বিভিন্ন সময় ট্রলার যোগেও মনপুরা যাওয়া যায়।

 

চর কুকরি-মুকরি

চর কুকরি-মুকরি বঙ্গপোসাগরের তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা একটি চর। চিরসবুজ গাছ-গাছালিতে ঘেরা, আর অসংখ্য নাম না জানা পাখ-পাখালি, সাথে কিছু বন্য জীব-জন্তুর অবাধ বিচরণভূমি এই চর কুকরি-মুকরিতে। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দৃষ্টিকে সম্মোহন করে হাতছানি দিতে থাকে টুকরো টুকরো নিবিড় বনভূমি। একদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, বৈরী বাতাস, জলোচ্ছ¡াসের গর্জন আর অন্যদিকে দেশের মূলভূখন্ডের সাথে জেগে ওঠা সবুজ দ্বীপ আর প্রাকৃতিক  সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। ওটাই চর কুকরি মুকরি। এখানকার মহিষের দুধের মিষ্টি এবং আখ ভ্রমণপিপাসুদের মনে দাগ কেটে থাকবে।

ব্রিটিশ আমলে জার্মানির যুবরাজ প্রিন্স ব্রাউন জনমানবহীন এ দ্বীপে জাহাজ নিয়ে বেড়াতে আসেন। তার আসার উদ্দেশ্য ছিল শিকার করা। কিন্তু এখানে তিনি শিকার করতে এসে দেখতে পান কেবল কয়েকটি কুকুর ও বিড়াল ছোটাছুটি করছে। নির্জন এ দ্বীপটিকে তাই তিনি কুকরি মুকরি নামে ডাকতে থাকেন। তা থেকেই এ দ্বীপের নাম হয়ে যায় চর কুকরি মুকরি। এরপর কয়েক বছর পর্তুগিজ ও ওলন্দাজরা ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং দস্যুপনায় মেতে ওঠে এই চরটিকে নিয়ে। এর চারদিকে সাগরের নীল জল। উত্তাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখলেই মনে হবে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পাশে আছেন আপনি। স্থানীয় মানুষ এ স্পটটিকে বালুর ধুম নামেও ডেকে থাকে।

তবে কুকরি মুকরির প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে সাগরপাড়। এখানে দাঁড়িয়ে আপনি সূর্যাস্ত কিংবা সূর্য ডোবার দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। চর কুকরি মুকরির এই বিশেষ সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা ভিড় করে থাকেন। নৌকা নিয়ে সারা দিন ভ্রমণ করা যায় এই স্থানটিতে। সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দেখা যায় উপকূলের সাহসী মানুষদের প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক সংগ্রামী প্রেরণা ও প্রেয়সীর স্বপ্নের ঘর বাধার অপরূপ বাসনা। তাই এখানে পর্যটনশিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এই স্থানটিকে নিয়ে।

চরফ্যাশনের দক্ষিণ উপকূলে দক্ষিণ আইচা থানার অন্তর্গত চর কুকরি মুকরি ইউনিয়নে ম্যানগ্রোভ বাগানের কয়েক হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে মানব সৃষ্ট সুন্দরবন। কেবল মাত্র প্রাকৃতিকভাবে নয় প্রকৃতি এবং মানুষের যৌথ উদ্দেগে বিকশিত হচ্ছে এ সুন্দরবনটি। আগামী ১৫-১৬ বছর পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবন হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ নিয়ে কাজ করছে কুকরি-মুকরি বন বিভাগ। সরকারী অর্থায়নে কুকরি বন গভেষনা বিভাগ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ১৯৭২ সনে চরফ্যাশনের দক্ষিণ উপকূলে কুকরি-মুকরিতে ম্যানগ্রোভ বাগান তৈরী করে বন বিভাগ। বর্তমানে কুকরিতে ৩ হাজার হেক্টর সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বাগান রয়েছে এবং আরো ৪ হাজার ৬ হেক্টর বাগান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢালচরেও ৬ হাজার হেক্টর বনায়ন করা হয়েছে।

এসব বাগানের বেশিরভাগই কেওড়া প্রজাতির গাছ রয়েছে। যা ২০ থেকে ২৫ বছর বয়স প্রাপ্তির পর পর্যায়ক্রমে মরতে শুরু করছে। কুকরি এবং ঢালচর রেঞ্জের আওতায় ১৫ টি বাগান রয়েছে। যেগুলো অপেক্ষাকৃত পুরাতন এবং টেকসই হয়েছে। এসব বাগানের উচ্চতা বেড়েছে। ফলে এখানে কেওড়া প্রজাতির ম্যানগ্রোভ বাগানের নিচে সুন্দরবনের বৃক্ষপ্রজাতিগুলোতে সৃষ্টি শুরু করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের ম্যানগ্রোভ বাগানের কেওড়া প্রজাতির বৃক্ষ মরে যাবে। যার শূণ্যস্থান দখল করবে সুন্দরবন প্রজাতির গাছ-সুন্দরী, পশুর, গেওয়া, খলসী, ধুন্দল, বাইন, কেরপা, হেন্তাল, গড়ান, গোলপাতা, কাঁকড়া এবং বাইন।

কুকরির চর দিগল, নার্সারির খাল, চর শফি, চর জমির এবং জাইল্যার খালের ১৬ একর বাগানে সুন্দর প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে এবং যাদের শতকরা ৮০ ভাগ বৃক্ষই টিকে গেছে যা প্রত্যাশা চেয়ে বেশি। কুকরি বন গবেষণা কর্মকর্তা জানান, ১৯৯০ সনে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে এখানে সুন্দরবন প্রজাতির বৃক্ষের চারা উৎপাদন এবং বনায়ন শুরু করা হয়। প্রথম প্রথম সুন্দরবন থেকে বীজ সংগ্রহ করে কুকরিতে সিডবেডে চারা উৎপাদন এবং বনায়ন করা হয়েছে। এখন কুকরির বাগানের গাছ থেকেই বীজ সংগ্রহ চারা উৎপাদন এবং বনায়ন করা হয়। আন্ডার প্লান্টিং ট্রায়েল উইথ ম্যানগ্রোভ স্পেসিস ইন দ্যা কোস্টাল বেল্ট অব বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বন গবেষণা ইউনিট মানব সৃষ্টি সুন্দরবন গড়ার কার্যক্রম এগুচ্ছে। ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন সময় রোপিত সুন্দরী, গরান, গেওয়াসহ সুন্দরবন প্রজাতির গাছগুলো ৩০/৪০ ফিট পর্যন্ত উঁচু হয়েছে। এসব গাছ থেকে বীজ ঝড়ে প্রাকৃতিকভাবেই বাগানগুলোতে নানান আকৃতির সুন্দর বন প্রজাতির গাছ ছেয়ে গেছে। সুন্দরবন প্রজাতির বৃক্ষের বিকাশের চলমান ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আগামী ১৫ বছর পর কুকরি হবে মানবসৃষ্ট সুন্দরবন আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবন।

এ বনে চিত্রা হরিণ, বানর, উদবিড়াল, শিয়াল, বন্য মহিষ-গরু, বন-বিড়াল, বন মোরগ প্রভৃতি বন্য প্রাণী। আর পাখি ও সরিসৃপ হিসেবে এই বনের অধিবাসীদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বক, বন মোরগ, শঙ্খচিল, মথুরা, কাঠময়ূর, কোয়েল, গুইসাঁপ, বেজি, কচ্ছপ ও নানা ধরনের সাপ ইত্যাদি প্রাণী রয়েছে।

কিভাবে যাওয়া যায়:

ভোলা থেকে প্রথমে চর ফ্যাশন এর চর কচ্ছপিয়াতে যেতে হবে। সেখান থেকে ট্রলার, নৌকা আথবা ছোট ছোট লঞ্চ দিয়ে চর কুকরি মুকরি যাওয়া যায়।

 

জ্যাকব ওয়াচ টাওয়ার

বাংলাদেশের ভোলা জেলায় অবস্থিত একটি দর্শনীয় স্থান। মূলত পর্যটকদের জন্য নির্মিত এটি একটি ওয়াচ টাওয়ার। এখান থেকে আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। এটি উপমহাদেশের সবচেয়ে উঁচু ওয়াচ টাওয়ার। স্থানীয় সংসদ সদস্য, বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের নামানুসারে টাওয়ারটির নামকরণ করা হয়েছে। ২২৫ ফুট উঁচু এই টাওয়ারটি ১৮ তলা বিল্ডিংয়ের সমান। ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় ওই টাওয়ারের চূড়ায় ওঠার জন্য সিঁড়ির পাশাপাশি থাকবে ১৬ জন ধারণক্ষমতার অত্যাধুনিক ক্যাপসুল লিফট। টাওয়ারটি থেকে বঙ্গোপসাগরসহ চরফ্যাসন শহরের চারপাশের ২০ কিমি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। মূল টাওয়ারটির পাশে রয়েছে মনোরম একটি কৃত্রিম পুকুর, শিশু পার্ক ও বিনোদন উদ্যান। দেশের ২য় বৃহত্তম এই ওয়াচ টাওয়ার থেকে উপভোগ করা যাবে চর কুকরি-মুকরি, তারুয়া সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ বনের কিছু অংশ এবং আসে পাশের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ১৮ তলা উচ্চতা বিশিষ্ট (২১৫ ফুট) টাওয়ার টিতে লিফট আছে, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বাইনোকুলার আছে যা দিয়ে ১০০ বর্গ কিমি এলাকা দেখা যাবে। ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়ালেই পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদীর শান্ত জলধারা, পূর্বে মেঘনা নদীর উথাল-পাতাল ঢেউ, দক্ষিণে চর কুকরি-মুকরিসহ বঙ্গোপসাগরের বিরাট অংশ নজরে আসবে।

প্রবেশ শুভেচ্ছা মুল্যঃ ১০০ টাকা।

বিঃদ্রঃ বুধবার বন্ধ থাকবে।

 

দেউলি

বোরহানুদ্দিন উপজেলার একটি সপ্রাচীন জনপদ হল দেউলি। ইতিসের পাতা থেকে জানা যায় যে, এই জনপদে একসময় রাজা জয়দেবের ছোচ সময়ে বিদ্যাসুন্দরী ও তার স্বামী বসবাস করত। দেউলির গুরিন্দাবাঢ়িতে এরই সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন ভবন। এ ছাড়াও দেউলিতে দবদ্যাসুন্দরী নামে একটি দিঘী রয়েছে, যার প্রত্নতাত্তিক মূল্য অপরিসীম।

কিভাবে যাওয়া যায়:

ভোলা থেকে বাসযোগে বোরহানুদ্দিন উপজেলায় যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে রিক্সাযোগে অথবা অটো রিক্সা দিয়ে যাওয়া যায়।

 

মনপুরা ফিশারিজ লিমিটেড

এটি স্থানীয় ফার্ম হাউজ ও পর্যটন অবকাশযাপন কেন্দ্রটির চিত্রা হরিণ, ডেইরী ফার্ম, পুকুর, বাগান ও নারিকেল গাছের সারিসহ সব ধরনের আধুনিক সুবিধা ভোলার অন্যতম প্রধান একটি পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

কিভাবে যাওয়া যায়:

ভোলা থেকে তজুমুদ্দিন সি ট্রাক ঘাটে যেতে হবে। সেখান থেকে বিকাল ৩.০০ টায় সি ট্রাক দিয়ে মনপুরায় যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা তেকে আসা লঞ্চেও মনপুরা যাওয়া যায়। আথবা দিনের বিভিন্ন সময় ট্রলার যোগেও মনপুরা যাওয়া যায়। মনপুরা ঘাটে নেমে রিক্সা অথবা অটো রিক্সা যোগে যাওয়া যায়।

 

ঢাল চর

বিগত এক দশক আগে ঢাল চর বনায়ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়, যা থেকে এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্থানে পরিনত হয়। এছাড়া ঢাল চর বিভিন্ন বনে হরিণ দেখতে পাওয়া যায়। ঢাল চরের দক্ষিণ দিক বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশে একটি সৈকতের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই স্থানটির নাম হল তারুয়া। ইতোমধ্যে তারুয়া স্থানটি অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিয়েছে। এখানকার কেওড়া বাগানটি এর সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে মেঘনা নদীর ঢেউ এমন রূপ পায় যা দেখলে মনে হবে আপনি সাগরের কোন সৈকতে অবস্থান করছেন।

কিভাবে যাওয়া যায়:

ভোলা থেকে প্রথমে চর ফ্যাশন এর চর কচ্ছপিয়াতে যেতে হবে । সেখান থেকে ট্রলার, নৌকা আথবা ছোট ছোট লঞ্চ দিয়ে ঢাল চর যাওয়া যায়।

 

মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশন

মনপুরার প্রধান শহরের প্রায় ৫ শত গজ পশ্চিমে মেঘনা নদীর কিনারায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ল্যান্ডিং স্টেশনটি। ২০০৫ সালের শেষের দিকে বরিশালস্থ মেসার্স রুপালী বিল্ডার্স ল্যান্ডিং স্টেশনের কাজ শুরু করে। যাত্রীবাহী সী-ট্রাক সহ অন্যান্য লঞ্চ-নোঙ্গরের পাশাপাশি যাত্রীদের উঠানামায় দারুন সুবিধা হবে ভেবে ল্যান্ডিং ষ্টেশনটি নির্মিত হয়। মেঘনার প্রচন্ড স্রোতের তীব্রতায় ল্যান্ডিং স্টেশনের সামনের ৪টি পিলার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। একপর্যায়ে পিলারগুলো নদী থেকে উঠিয়ে পুনরায় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কাজ শুরু করে ঠিকাদার। পরবর্তীতে কাজও সম্পন্ন করা হয়। সী-ট্রাকসহ অন্যান্য যাত্রীবাহী লঞ্চ, ট্রলার পিলারের সাথে বেধে নোঙ্গর করে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য এটি নির্মিত হলেও বর্তমানে সে ব্যাপারে কোন কাজে আসছেনা।

মনপুরাবাসী একদিকে নিরাশ হলেও অন্যদিকে বিকালের আড্ডায় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন ল্যান্ডিং স্টেশনকে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে এখানে ঘুড়তে আসে। পড়ন্ত বিকেলে এখানকার আড্ডায় পর্যটনের একটি উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছেন সূর্য অস্ত যাওয়ার অপরুপ দৃশ্য। এখানকার হাজার হাজার মানুষের মনকে প্রফুল্ল করতে কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি বর্তমানে রাক্ষুসে মেঘনার যাতাকলে পিষ্ট। 

কিভাবে যাওয়া যায়:

হাজিরহাট সদর থেকে পায়ে হেঁটে মাত্র ৫ মিনিটে ল্যান্ডিং স্টেশনে যাওয়া যায়।

ভোলার কাঁচা দুধের দধি, ছানা মিষ্টি ও মহিষ বাথান

ভোলায় কাঁচা দুধের দধি ছাড়া বিয়ে থেকে শুরু করে যে কোনো পারিবারিক প্রীতিভোজই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। ব্রিটিশ আমল কিংবা তারও আগে থেকে ভোলা শহরের ঘোষ সম্প্রদায়ের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আর সুস্বাদু দধি তৈরির ঐতিহ্য নিয়ে সরগরম ওই ঘোষপট্টি। দিনের পর দিন ঐতিহ্যের গুরুত্ব যেন বাড়ছে। ঘোষপট্টিতে কাঁচা দুধের দধি, গাভির দুধের দধি, আর মিষ্টি সন্দেশের দোকান রয়েছে ৫০টির মতো। কৃষিভিত্তিক এই কুটির শিল্প যুগ যুগ ধরে ভোলা ও আশপাশের জেলার মানুষের জীবনে অতুলনীয় মিষ্টান্ন আর দধির স্বাদ গ্রহণের সুযোগ দিয়ে আসছে। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আইতে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছেন ঐতিহ্যবাহী ভোলার চরাঞ্চলের মহিষ বাথানের বিচিত্র গল্প। যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে একশ্রেণির পশু পালক মহিষ লালন-পালন করে। মহিষ বাথানের জীবন-জীবিকা, সংগ্রামের হিসাব বেশির ভাগ মানুষেরই অজানা। মহিষ বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল দেহধারী চতুষ্পদ প্রাণী। যার গায়ের রং কালো কুচকুচে। বড় দুটি শিং। কিছুটা হিংস্রস্বভাবের এ প্রাণীর দেখা মিলবে ভোলার দখিনের যে কোন চর কিংবা দ্বীপ গাঁয়ে পা রাখলেই। খোলা সবুজ চর-দ্বীপগুলোতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো আর নদী-সাগরের পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গা চুবিয়ে গড়াগড়িতেই মহিষের আনন্দ। একটা সময়ে দক্ষিণ উপকূলে মহিষের সংখ্যা ছিল আরও। প্রায় প্রতিটি অবস্থাপন্ন কৃষকের ছিল মহিষের বাথান। একেকটি বাথানে তিন-চার শ’ কিংবা তার চেয়েও বেশি মহিষ ছিল। অবস্থাপন্নদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেকটা নির্ভর করত মহিষের সংখ্যার ওপর। যার যত বেশি মহিষ, তার দাপট তত বেশি। সে সময় মহিষের দুধ, ঘি, দই এতটাই সস্তা ছিল যে, তা খাওয়ার মানুষ পর্যন্ত ছিল না। একমাত্র বাথান দেখাশোনাকারী রাখালদের পেটে কিছুটা যেত। বাকিটার হতো অপচয়। তবে মূলত রাখালদের হাত ধরেই এ অঞ্চলে মহিষের দই জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় উঠে আসে।

একেকটি মাদি মহিষ সর্বনিম্ন তিন-চার লিটার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দশ-বারো লিটার পর্যন্ত দুধ দেয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বর্ষায় মহিষের দুধ হয় বেশি। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ দু’ভাবে মহিষের দই পাতে বা তৈরি করে। দুধ চুলায় জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে যেমন দই পাতা যায়। আবার একেবারে কাঁচা দুধ দিয়েও দই পাতা হয়। তবে চুলায় জ্বাল দেয়া দইয়ের তুলনায় কাঁচা দইয়ের স্বাদ বেশি। বেশ টক টক লাগে। চব্বিশ ঘন্টাতেই দুধ জমে ঘন দই হয়। দইয়ের ওপরে জমে ওঠে ননি বা মাখনের পুরো আস্তর। ননি দিয়ে তৈরি হয় ঘি। গরুর দুধের চেয়ে মহিষের দইয়ে অনেক ননি। ফ্রিজে মহিষের দই তেমন পুষ্টি হয় না। স্বাদও অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। দই পাতার জন্য নতুন মাটির পাতিল ব্যবহার সবচেয়ে ভাল।

বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা এবং ভোলা অঞ্চলের মানুষের কাছে আবহমান কাল থেকে মহিষের দই সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। ছেলে বুড়ো সবার কাছেই রয়েছে এর সমান কদর। মোটা চালের ভাপ ওঠা গরম ভাত। সঙ্গে খেজুরের গুড় আর মহিষের দই। তুলনাহীন খাবার। এখনও চরাঞ্চলের বহু পরিবার পান্তা ভাতেও মহিষের দই খায়। চিড়া মুড়ি খেজুরের সঙ্গে মহিষের দই সকালের নাস্তা হিসেবেও উপাদেয় খাবার। তাই বরিশালের দক্ষিণ উপকূলের মানুষের খাবারের তালিকায় শীর্ষ স্থানটি আজও দখল করে আছে মহিষের দই। রূপ রস বর্ণ যে কোন দিক থেকেই হোক না কেন, এর খ্যাতি এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং বেড়েছে। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে নানা অনুষ্ঠানে আজকাল মহিষের দই ব্যবহার হচ্ছে। বহু অভিজাত পরিবারের খাবার টেবিলে দেখা মেলে মহিষের দই। দূর শহর থেকে নতুন বদলি হয়ে কর্মস্থলে আসা কর্মকর্তাদেরও সবার আগে চাই মহিষের দই। সবমিলিয়ে দক্ষিণের বিশেষ করে চর-দ্বীপাঞ্চলের মহিষের দইয়ের পরিচিতি এখন আঞ্চলিকতার গন্ডি ছাড়িয়ে গেছে।

দুধ থেকে দই ছাড়াও ভোলায় তৈরি হয় ছানা রসগোল্লা বা ছানা মিষ্টি। ভোলার ঐতিহ্যবাহী ছানার রসগোল্লা। এটি ভোলা ছাড়া দেশের অন্য কোন জেলায় তৈরী হয় না। তাই ভোলার ছানার রসোগোল্লার কদর রয়েছে সর্বত্র। অনেকটা বগুরার দই, সিলেটের চা, দিনাজপুরের লিচু, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুষ্টিয়ার তিলেরখাজার যেমনটা রয়েছে। ভোলার ঘুইংগারহাট এলাকায় এ ছানা রসগোল্লা তৈরি হয়। এ মিষ্টি যে খেয়েছে সে দেশের যেখানেই থাকুক, ভোলায় আসলে ঘুইংগারহাটের মিষ্টি না খেয়ে যায় না মিষ্টিভোজিরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভোলার এ মিষ্টি ও দধি উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!