গোলাপের রাজ্য ঘুরে আসুন দিনে দিনেই

পিচ ঢালা পথ ধরে গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা সরু পথ। পথের দু’ধার ঘেঁষে অসংখ্য গোলাপের বাগানে মনে হয় এ যেন ফুলের রাজ্য। যত দূর তাকাবেন, শুধুই গোলাপের সমারোহ। মাঝে মাঝে কিছু সাদা গোলাপ, গ্লাডিওলাস, জারবেরার বাগানও চোখে পড়বে। মন মাতানো দৃশ্য আর গোলাপের সৌন্দর্য নিয়ে পুরো গ্রাম সেজে আছে। শুধু সাদুল্লাহপুর নয়, আশপাশের শ্যামপুর, কমলাপুর, বাগ্মীবাড়ি গ্রামের গোলাপের রাজ্যে চোখ আটকে যেতে বাধ্য। তাই এ গ্রামগুলো এখন ‘গোলাপ গ্রাম’ নামেই বেশি পরিচিত।

অবস্থান

ইট পাথর আর কংক্রিটের এই ঢাকা শহরে যখন হাঁপিয়ে উঠবেন তখন আপনার সন্নিকটেই ঢাকার খুব কাছেই সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত সাদুল্লাহপুরে একটু মুক্ত হাওয়া আর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন। মুলত তুরাগ নদীর অববাহিকায় মিরপুর বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে অবস্থিত সাদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, মোস্তা পাড়া গ্রাম। এ গ্রামগুলোই সমন্বিতভাবে ‘গোলাপ গ্রাম’ নামে পরিচিত। যাঁরা প্রকৃতির সান্নিধ্য ভালোবাসেন, যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে চান তাঁরা একটু সময় বের করে ঘুরে আসুন লাল গোলাপের রাজ্য থেকে।

যা দেখবেন

মিরপুরের দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট থেকে সাদুল্লাপুর ঘাটের যাত্রাপথে পনি মুগ্ধ হবেন। বিস্তৃত লাউখেত, লাউয়ের মাচায় বসা অসংখ্য পাখি আপনাকে বিমোহিত করবে। সাদুল্লাপুর নবাবদের বাইগুন বাড়ি নামে খ্যাত। এটি ছিল ঢাকার নবাবদের সংরক্ষিত শিকার কানন। বাইগুন বাড়িতে কাছারি ঘরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।

খাবার

দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো। তবে হোটেল আছে, সেখানেও খেতে পারেন। দলবেঁধে গেলে আগে থেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে যাবেন। সাদুল্লাপুর ঘাটের বটতলার হাটে মিরচিনি, মুরালি, দই, মিষ্টিসহ অন্যান্য খাবার পাবেন। এছাড়া গরুর দুধের চা ও দুধ মালাইয়ের স্বাদ নিতে পারবেন।
মিরপুরের দিয়াবাড়ি থেকে ট্রলারে উঠলে ৪০ মিনিটের মধ্যে আপনাকে নামিয়ে দেবে সাদুল্লাহপুর বটতলায়। বেশ বড় বটবৃক্ষটির পাশেই ছোটখাট একটু বাজার। এখানে চা সিংগাড়া খেয়ে সোজা পিচঢালা পথ দিয়ে কিছু দূর গেলেই চোখে পড়বে গোলাপ ক্ষেত। যেখানে তারায় মতো ফুটে রয়েছে গোলাপ। এ পিচঢালা পথ ধরে যত আগাতে থাকবেন ততই দেখবেন গোলাপ ফুলের বাগান। সাদুল্লাহপুর ও এর আশপাশের গ্রামের ফুলচাষিরা বিকেলে ফুল কেটে নিয়ে চলে আসেন হাটে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যাপারীরা এসে ভিড় জমান। রাতে জমে বেচাকেনা। ভোর হওয়ার আগেই গোলাপ গ্রামের ফুল পৌঁছে যায় রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা ফুল বিক্রির দোকানে।

যেভাবে যাবেন গোলাপ গ্রামে: ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আপনি গাবতলী আসতে পারেন। ভাড়া ২০-২৫ টাকা। এরপর গাবতলী বাসস্টান্ড থেকে যেকোনো বাসে সাভার বাসস্ট্যান্ডের ওভারব্রিজের নিচে নামতে হবে। গাড়ি ভাড়া ২৫ টাকা। ওভারব্রিজ পাড় হয়ে পূর্ব দিকের বিরুলিয়া ইউনিয়নের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত হ্যালো বাইকে করে ভাড়া ২০ টাকা দূরত্ব হবে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার। চলে যাবেন স্বপ্নের মতো সুন্দর গোলাপ গ্রামে।

অন্যান্য যাতায়াত ব্যবস্থা: মিরপুর শাহআলী মাজার এর সামনে কোনাবাড়ী বাসষ্ট্যান্ড থেকে বাসে করে আকরান বাজার। ভাড়া ২০ টাকা। আকরান বাজার থেকে অটোতে করে ফুলের বাজারে কিংবা সাদুল্লাহপুর গ্রাম। ভাড়া ১০ টাকা। নিজস্ব পরিবহনে যেতে চাইলে এই পথ দিয়ে যাওয়া যাবে।

সাভার থেকে আসতে চাইলে সাভার চৌরংগী মার্কেটের সামনে থেকে লেগুনা/মিনি বাস আসে আকরান বাজার। এরপর আকরাম বাজার থেকে অটোতে সাদুল্লাহপুর গ্রাম। নিজস্ব পরিবহনেও এই পথ দিয়ে আসা যাবে।

আবদুল্লাহপুর/উত্তরা থেকে আসতে চাইলে আশুলিয়া রোড দিয়ে লেগুনা দিয়ে বিরুলিয়া ব্রিজ নামতে হবে। ব্রিজ থেকে অটো/মিনি বাসে করে আকরান বাজার সেখান থেকে অটোতে সাদুল্লাহপুর গ্রাম। নিজস্ব পরিবহনেও এই পথ দিয়ে আসা যাবে।

নবীনগর/জিরাবো/সাভার থেকে আলিফ/মোহনা পরিবহনে করে আসলে বিরুলিয়া ব্রিজ। ব্রিজ থেকে অটো/মিনি বাসে করে আকরান বাজার সেখান অটোতে থেকে সাদুল্লাহপুর গ্রাম। নিজস্ব পরিবহনেও এই পথ দিয়ে আসা যাবে।

সতর্কতা: যারা সাঁতার জানেন না তাদের স্থলপথে গোলাপ গ্রামে যাওয়াই ভাল। আর যারা নৌপথে ভ্রমণ করবেন তারা সন্ধ্যা ৭ থেকে ৮ টার মধ্যে ফেরার চেষ্টা করবেন। কারণ রাত আটটার পর নৌ-চলাচল বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বন্ধ থাকে। গোলাপ বাগানে গিয়ে গোলাপ ছিড়বেন না। গ্রামে ভালো খাবারের হোটেল না থাকায় আপনি খাবার নিয়ে যেতে পারেন। গ্রামের মানুষ বিরক্ত বা তাদের অসুবিধা হয় এমন কাজ করবেন না।

ট্রলারে সাদুল্লাহপুর যেতে চাইলে গাবতলী মাজার রোড কিংবা মিরপুর-১ নম্বর গোলচত্বর নেমে রিকশায় দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট যেতে হবে। ঘাট থেকে ৩০ মিনিট পরপর সাদুল্লাহপুরের উদ্দেশে ট্রলার ছাড়ে। জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। হেঁটেই সাদুল্লাহপুর ও এর আশপাশের গ্রাম ঘোরা যায়।

দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট থেকে ট্রলারে সাদুল্লাহপুর ঘাটে যাওয়ার সময়টুকু মুগ্ধ হওয়ার মতো। নদীর দুই তীরের মনোরম দৃশ্য চোখে প্রশান্তি দেয়। ট্রলারে প্রায় আধা ঘণ্টা লাগে সাদুল্লাহপুর যেতে। আর ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে মিরপুর বেড়িবাঁধ ধরে বিরুলিয়া সেতু হয়ে সোজা গেলে আকরান বাজার। বাজার থেকে বাঁয়ের পথ ধরে এগোলেই দেখা মিলবে গোলাপ রাজ্যের।