সোনালি সেতুর শ্যামল্ভূমি- শরিয়তপুর

সোনালি সেতুর শ্যামল্ভূমি- শরিয়তপুর

উত্তরে প্রমত্তা পদ্মা, পশ্চিমে কীর্তিনাশা ও পূর্বে মেঘনা নদী পরিবেষ্টিত সোনালী সেতুর শ্যামল ভূমি শরিয়তপুর জেলা। ঐতিহ্য দর্শনীয় স্থান, স্থাপনা নির্মানে এই জেলার সুনাম বিশ্ব জোরা। সুরেশ্বরী পীর কামেল বাবা জান শরীফের পূন্যভূমি হিসেবে পরিচিত শরিয়তপুর জেলা ইতিহাস বিখ্যাত ফরায়েজী আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ হাজী শরীয়তুল্লাহর নাম অনুসারে নামাঙ্কিত। ৩ দিক থেকেই নদী বেষ্টিত হওয়ায় বছরের পর বছর নদী ভাঙ্গার সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে। ঐতিহ্যবাহী কাস-পিতলের নিরন্তন ঘণ্টাধ্বনি, মৃত শিল্পের নকশা কাহিনী, জেলে-বেদের কামার-কুমারদের জীবন জীবিকার বিচিত্র কাহিনী এ জেলায় রয়েছে।  

শরিয়তপুর ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। এই জেলার উত্তরে মুন্সীগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে বরিশাল জেলা, পুর্বে চাঁদপুর জেলা এবং পশ্চিমে মাদারিপুর জেলা। এটি মূলত চর এলাকা। আয়তন ১১৮১.৫৩ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১০.৮০ লাখ।

প্রশাসনিক এলাকা- শরিয়তপুর জেলা ৬ টি উপজেলা, ৭ টি থানা, ৫টি মিউনিসিপ্যালিটি, ৬৪টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৫টি ওয়ার্ড, ৯৩টি মহল্লা, ১২৩০টি গ্রাম এবং ৬০৭টি মৌজা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলঃ জাজিরা, শরীয়তপুর সদর, গোসাইরহাট, ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ, নড়িয়া।

এ জেলার উল্লেখযোগ্য নদীর মধ্যে রয়েছে পদ্মা, মেঘনা, দামুদিয়া, আরিয়াল খাঁ। এ সকল নদীর অসংখ্য শাখা নদীও রয়েছে। লোকসংস্কৃতি- এ জেলায় নববর্ষ, চৈত্র সংক্রান্তি, নৌকাবাইচ উল্লেখযোগ্য লোকউৎসব। জারিগান, যাত্রা, কবিগান, বিয়ের গান প্রভৃতি লোকসঙ্গীত বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া এ জেলায় হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধাসহ নানা ধরণের লোকক্রীড়ার প্রচলন রয়েছে। পৌষ ও চৈত্র সংক্রান্তিতে পূর্বে এখানে ষাঁড়দৌড় হতো।

দর্শনীয় স্থান

  • সুরেশ্বর দরবার শরীফ – নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর;
  • মডার্ন ফ্যান্টাসি কিংডম-নড়িয়ার, কেদারপুর, কলুকাঠি;
  • বুড়ির হাট মসজিদ – ডামুড্যা উপজেলার বুড়ির হাট;
  • বুড়ির হাট মুন্সী বাড়ী – ডামুড্যা উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়ন;
  • লাকার্তা শিকদার বাড়ি – ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়ন;
  • পন্ডিতসার;
  • রুদ্রকর মঠ – সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়ন;
  • মগর;
  • শিবলিঙ্গ – নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়ন;
  • মহিষারের দীঘি – দক্ষিণ বিক্রমপুর;
  • রাজনগর;
  • কুরাশি;
  • হাটুরিয়া জমিদার বাড়ি – গোসাইরহাট উপজেলা;
  • রাম সাধুর আশ্রম – নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়ন;
  • মানসিংহের বাড়ী – নড়িয়া উপজেলায় ফতেজংগপুর;
  • ধানুকার মনসা বাড়ি।
  • কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি
  • কোদালপুর দরবার শরীফ
  • মডার্ন ফ্যান্টাসি কিংডম
  • বুড়ির হাট মসজিদ
  • বুড়ির হাট মুন্সী বাড়ী
  • লাকার্তা শিকদার বাড়ি
  • পন্ডিতসার
  • রুদ্রকর মঠ
  • হাটুরিয়া জমিদার বাড়ি
  • রুদ্রকর জমিদার বাড়ি
  • রুদ্রকর মঠ
  • রাম সাধুর আশ্রম
  • মানসিংহের বাড়ী
  • ধানুকার মনসা বাড়ি
  • সখিপুর আনন্দবাজার বেরিবাধ
  • আলুর বাজার ফেরিঘাট
  • ছয়গাঁও জমিদার বাড়ি

কৃতি ব্যক্তিত্ব

  • কেদার রায় – বার ভুঁইয়ার অন্যতম ও বিক্রমপুর পরগনার জমিদার;
  • রাম ঠাকুর – হিন্দু ধর্মগুরু এবং সাধক;
  • পুলিন বিহারী দাস – ব্রিটিশ বিরোধী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রধান (১৯০৭-১০);
  • অতুলপ্রসাদ সেন – আইন ব্যবসা ও গানের গীতিকার;
  • যোগেশচন্দ্র ঘোষ – আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ; সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা;
  • গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৯৫-১৯৮১) – পতঙ্গবিশারদ, উদ্ভিদবিদ;
  • গোষ্ঠ পাল (১৮৯৬-১৯৭৫) – ফুটবলার, ভারত সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী উপাধিতে (১৯৬২) ভূষিত হন;
  • গোলাম মওলা (১৯২০-১৯৬৭)- চিকিৎসক ও ভাষা সৈনিক;
  • আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩)- কবি ও সাহিত্যিক;
  • ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী (১৯৩৭- ) – মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক,সংসদ সদস্য এবং ডেপুটি স্পীকার।
  • নগেন্দ্রশেখর চক্রবর্তী- ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
  • আবিদুর রেজা খান – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রাক্তন সাংসদ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের প্রথম গভর্নর; আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাণ্ডারি।
  • ছেবৎ আলী দেওয়ান – ঐতিহাসিক দেওয়ান বংশের প্রতিষ্ঠাতা।
  • আব্দুর রাজ্জাক (রাজনীতিবিদ), প্রাক্তন পানি সম্পদ মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মহান মুক্তিযোদ্ধা।
  • আবদুল মোতালেব সরদার – প্রাক্তন ফুটবল খেলোয়াড় কলকাতা মোহামেডান ।
  • রাজবল্লভ সেন – বিক্রমপুর রাজা
  • নাহিম রাজ্জাক এমপি, শরীয়তপুর ৩ (ভেদরগঞ্জ,ডামুড্যা ও গোশাইরহাট)
  • এ কে এম এনামুল হক শামীম – উপমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ

কিভাবে যাবেন?

স্থল পথে

সড়ক পথের চাইতে নৌ পথে যাতায়াতই বেশি সুবিধাজনক। সুবিধাজনক হলেও সড়ক পথের চেয়ে নৌপথে বেশি সময় লাগে।সড়ক পথে ঢাকা থেকে শরীয়তপুর জেলা সদরে সর্বনিন্ম দুই ঘন্টা পনের মিনিট থেকে দুই ঘন্টা ত্রিশ মিনিটের পৌছানো সম্ভব।

বৃহত্তর পদ্মা নদী ঢাকা ও শরীয়তপুর রুটের মাঝে অবস্থিত হওয়ার কারণে ঢাকা থেকে শরীয়তপুর রুটে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এখনও তৈরি হয় নি। তবে ফেরি যোগে সরাসরি ঢাকা থেকে শরীয়তপুর যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকার সায়েদাবাদের পশ্চিম কর্নার থেকে প্রতিদিন গ্লোরী পরিবহনের দুটি করে বাস শরীয়তপুর ঢাকা–শরীয়তপুর রুটে চলাচল করে। সকাল ১০.০০ টায় এবং বিকাল ০৫.০০ টায় গাড়িদুটি ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। সরাসরি বাস যোগাযোগ শুধুমাত্র শরীয়তপুর সদর পর্যন্ত রয়েছে। এছাড়া লোকাল বাস যোগে মাওয়া হয়ে সড়কপথে শরীয়তপুর যাওয়া যায়। ঢাকার গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে মাওয়ার বাসগুলো প্রতি ১৫ মিনিট পরপর ছেড়ে যায়। ঢাকা–মাওয়া রুটের যাত্রাবাহী উল্লেখযোগ্য বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে – বিআরটিসি, ইলিশ পরিবহন, আনন্দ পরিবহন, গাংচিল পরিবহন, গ্রেট বিক্রমপুর পরিবহন, গোধুলী পরিবহন ইত্যাদি। এসকল পরিবহনের বাসগুলো ঢাকা–মাওয়া রুটে কাউন্টার ভিত্তিতে সরাসরি চলাচল করে। উপরোক্ত বাসগুলো ছাড়া ভুলেও কোনো লোকাল বাসে উঠবেন না। তাহলে আপনার যাত্রা বিরক্তিকর হয়ে উঠবে। গুলিস্তান সুন্দরবন স্কয়ারের পূর্ব পাশ থেকে এবং যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার দক্ষিণ-পূর্ব পাশ থেকে মাওয়ার বাসগুলো ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে মাওয়ার ভাড়া জনপ্রতি ৬০ টাকা।

মাওয়া থেকে লঞ্চ, ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও স্পিডবোট যোগে নদী পারাপারের ব্যবস্থা রয়েছে। তেমন কোনো তাড়া না থাকলে লঞ্চে যাতায়াতই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। লঞ্চযোগে মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের মাঝিরঘাট যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টা থেকে ১ ঘন্টা ২০ মিনিট। ভাড়া জনপ্রতি ঘাটে দিতে হয় ৫ টাকা এবং লঞ্চ ভাড়া ২০ টাকা। স্পিডবোটে নদী পার হতে সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। তবে লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চে উঠার সময় একটু জেনে নিবেন আপনি যেই লঞ্চে উঠছেন সেটি মাঝিরঘাটের লঞ্চ কিনা। কেননা একই লঞ্চ ঘাট থেকে কাওড়াকান্দি রুটের লঞ্চও ছাড়ে। তাই আপনি যদি অসর্তকতাবশত ভুল লঞ্চে উঠে পড়েন তাহলে আপনার সময় ও অর্থ দুই-ই নষ্ট হবে।

শরীয়তপুর মাঝিরঘাট থেকে বিভিন্ন উপজেলায় যাতায়াতের জন্য রুটভিত্তিক আলাদা আলাদা বাস রয়েছে। রুটগুলো হলো: মাঝিরঘাট – শরীয়তপুর সদর; মাঝিরঘাট – ভেদরগঞ্জ; মাঝিরঘাট – নড়িয়া; মাঝিরঘাট – সখিপুর। শরীয়তপুর সদর ও নড়িয়া রুটে লোকাল ও গেটলক উভয় ধরনের বাস রয়েছে। প্রতি ২০/২৫ মিনিট পরপর বাসগুলো ছেড়ে যায়।

আকাশ পথে- এই জেলাটিতে কোনো ট্রেন বা বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয় নি।

নৌ পথে ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও রাতে একাধিক যাত্রীবাহী লঞ্চ এই জেলার বিভিন্ন উপজেলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

ঢাকা – ভেদরগঞ্জ

এটি ঢাকা-শরীয়তপুর নৌ যোগাযোগের একটি রুট। নাব্যতা সংকটের কারণে এই রুটটি শুধুমাত্র বর্ষাকালে চালু থাকে। অন্যান্য সময় এই রুটের লঞ্চগুলো সুরেশ্বর ঘাট পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করে থাকে। সুরেশ্বর ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা অটো রিক্সা যোগে ভেদরগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্ষাকালে প্রতিদিন সকালে ১টি ও রাতে ১/২ টি করে লঞ্চ নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করে। পথিমধ্যে এই রুটের লঞ্চগুলো কার্তিকপুর, রামভদ্রপুর সহ আরও কয়েকটি ঘাটে যাত্রী উঠানামা করে থাকে। এই রুটের লঞ্চগুলোর ডেকের ভাড়া ১৫০ টাকা; সিঙ্গেল কেবিন ৪০০ টাকা ও ডাবল কেবিন ৮০০ টাকা।

ঢাকা – ওয়াপদা

ঢাকা থেকে শরীয়তপুরের আরেকটি নৌ রুট হচ্ছে ঢাকা–ওয়াপদা। সারা বছরব্যাপীই এই রুটটি চালু থাকে। প্রতিদিন সকালে ১টি, দুপুরে ১টি এবং রাতে ২/৩টি লঞ্চ এই রুটে চলাচল করে। যাত্রাপথে এই রুটের লঞ্চগুলো পথিমধ্যে সুরেশ্বর ও চন্ডিপুর ঘাটে যাত্রী উঠানামা করে থাকে। এই রুটের লঞ্চগুলোর ডেকের ভাড়া ১৫০ টাকা; সিঙ্গেল কেবিন ৪০০ টাকা ও ডাবল কেবিন ৮০০ টাকা।

ঢাকা – ডামুড্যা

ডামুড্যা শরীয়তপুর জেলার অন্যতম একটি উপজেলা। এই উপজেলার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন রাত ১০ টায় ১টি এবং রাত ১১ টায় একটি করে মোট ২টি লঞ্চ ছেড়ে যায়। এই রুটে দিনের বেলা কোনো লঞ্চ নেই। এই রুটের লঞ্চগুলো পথিমধ্যে পট্টি, গোসাইরহাট, তালতলা, কোদালপুর, হাটুরিয়া ঘাটে যাত্রী উঠানামা করে থাকে। এই রুটের লঞ্চগুলোর ডেকের ভাড়া ১৫০ টাকা; সিঙ্গেল কেবিন ৪০০ টাকা ও ডাবল কেবিন ৮০০ টাকা।

ঢাকা – ভোজেশ্বর

নাব্যতা সংকটের কারণে শুধুমাত্র বর্ষাকালে এই রুটে লঞ্চ চলাচল করে। বর্ষাকালে ঢাকা থেকে শরীয়তপুর জেলার এই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন সকালে ও রাতে ১টি করে লঞ্চ যাতায়াত করে। নদীতে পানি বেশি থাকলে এই রুটের লঞ্চগুলো শরীয়তপুর সদর পর্যন্ত যাতায়াত করে। পথিমধ্যে এই রুটের লঞ্চগুলো সুরেশ্বর, চন্ডিপুর ও ওয়াপদা ঘাটে যাত্রী উঠানামা করে থাকে। এই রুটের লঞ্চগুলোর ডেকের ভাড়া ১৫০ টাকা; সিঙ্গেল কেবিন ৪০০ টাকা ও ডাবল কেবিন ৮০০ টাকা।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!