হাওর কন্যা সুনামগঞ্জ

হাওর কন্যা সুনামগঞ্জ

‘দ্য ডটার অব হাওর’ বাংলায় হাওরকন্যা খ্যাত সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব সীমান্তে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের কোলঘেষে সিলেট বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা। মৎস্য, পাথর,  বালু ও ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ। এ জেলার তথা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণ করছে বেশ ক’জন প্রতিথযশা মরমী কবি। মরমী সংস্কৃতি ও বাউল সংগীতকে লালন-পালন ও অঙ্গে ধারণ করে বিখ্যাত হয়েছেন হাছন রাজা, রাধারমণ ও শাহ আব্দুল করিম। সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল প্রাচীন কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ‘সুনামদি’ নামক জনৈক মোগল সিপাহীর নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘সুনামদি’ (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামক উক্ত মোগল সৈন্যের কোন এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক সুনামদিকে এখানে কিছু ভূমি পুরস্কার হিসাবে দান করা হয়। তাঁর দানস্বরূপ প্রাপ্ত ভূমিতে তাঁরই নামে সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়েছিল। এভাবে সুনামগঞ্জ নামের ও স্থানের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে।

১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে সুনামগঞ্জকে মহকুমায় এবং ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে জেলায় উন্নীত করা হয়। আয়তন: ৩,৬৬৯.৫৮ বর্গ কিমি। সুনামগঞ্জের উত্তরে মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সিলেট জেলা, পশ্চিমে নেত্রকোনা জেলা। জনসংখ্যা ২৪,৬৭,৯৬৮ জন। (আদমশুমারী ২০১১)। সুনামগঞ্জে উপজেলা ১১টি, পৌরসভা ৪টি, ইউনিয়ন ৮৭টি, মৌজা ১৫৩৫টি। উপজেলাগুলো হচ্ছে: সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর, দিরাই, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, শাল্লা ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা।

প্রাচীনকাল থেকে বহু ভাষাভাষী জাতি, বর্ণ ও ধর্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছে সুনামগঞ্জ অঞ্চল। এ জেলায় মনিপুরী, খাসিয়া, হাজং, গারো প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। প্রধান নদী- সুরমা, কুশিয়ারা, ধামালিয়া, যাদুকাটা, বাগড়া, ডাহুকা, সোমেশ্বরী, বাউলী। লোকসংস্কৃতি হালযাত্রা, গোরমার নাচ, ধামাইল ও সূর্যব্রত গান, বীজবাস-ব্রত, বনলক্ষ্মীব্রত, ক্ষীরবাসব্রত, ফিরাল প্রভৃতি লোকজ আচার-অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য।

 

দর্শনীয় স্থান

টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক বা সিরাজ উদ্দীন লেক, ল্যাকমাছড়া, বারিক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী, জয়নাল আবেদীনের শিমুল বাগান, হাসন রাজার বাড়ি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম মিউজিয়াম ধল, শাহ আরেফিন (রঃ) মাজার, নারায়ণতলা, সৈয়দপুর গ্রাম, নারায়ণতলা মিশন, পণতীর্থ স্মৃতি ধাম, বাঁশতলা শহীদ স্মৃতিসৌধ, লাউড়েরগর, ডলুরা স্মৃতি সৌধ, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প, সুখাইড় জমিদার বাড়ী, শাহ কালাম কোহাফাহ্‌ (রহ.)-এর রওজা, পাইলগাঁওয়ের জমিদার বাড়ি, গৌরারং জমিদার বাড়ি, হাওলি জমিদার বাড়ি, পানাইল জমিদার বাড়ি, নদনদী, সুনামগঞ্জ জেলায় রয়েছে জাদুকাটা নদী।

 

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম (একুশে পদক পাপ্ত); সৈয়দ শাহনুর (১৭৩০- ১৮৫৪) একজন বাংলাদেশী মরমী কবি ও সাহিত্যিক। তিনি সাধক কবি ও পীর হিসেবে সমধিক পরিচিত; রাধারমণ দত্ত বা রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ (১৮৩৩ – ১৯১৫) হলেন একজন বাংলা সাহিত্যিক, সাধক বৈঞ্চব কবি; ধামালি গান ও নৃত্যের প্রবর্তক, হাসন রাজা, (২১ ডিসেম্বর, ১৮৫৪ – ৬ ডিসেম্বর, ১৯২২) বাংলাদেশের একজন মরমী কবি এবং জমিদার। দুর্বিন শাহ, মরমী কবি। কামাল উদ্দিন মরমী সাধক, গীতিকার। সৈয়দা শাহার বানু, (১৯১৪-১৯৮৩) ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং সিলেটে নারী জাগরণের অগ্রদূত। শাহ আবদুল করিম।

 

যাতায়াত

সড়ক পথে ঢাকা হতে সুনামগঞ্জের দূরত্ব ২৯৬ কিলোমিটার এবং রেলপথে ঢাকা হতে সিলেট রেল স্টেশনের দূরত্ব ৩১৯ কিলোমিটার; এখানে রেল যোগাযোগ নেই বিধায়, প্রথমে সিলেট এসে তারপর সুনামগঞ্জ আসতে হয়। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক দূরত্ব ৬৮ কি:মি:। ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সুনামগঞ্জে আসার সরাসরি দুরপাল্লার এসি ও নন-এসি বাস সার্ভিস আছে; এগুলোতে সময় লাগে ৫.৩০ – ৮ ঘন্টা। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে মামুন, শ্যামলী, এনা, নূর, একতা, সৌদিয়া, নিউ লাইন, মিতালী প্রভৃতি পরিবহণ কোম্পানীর বাস আছে প্রতি ঘন্টায়। এছাড়াও বিআরটিসি (কুমিল্লা হতে), নাসিরাবাদ (ময়মনসিংহ হতে) পরিবহণ কোম্পানীর বাসে আসা যায়।

মামুন পরিবহনঃ ☎ ০৮৭১-৬১১৬৭ (সুনামগঞ্জ), ০১৭১৮-৪৩৮ ৭৩২ (ফকিরাপুল), ০১৭১১-৩৩৭ ৮৫১ (সায়েদাবাদ); এনা পরিবহনঃ মোবাইল: ০১৭৭৬-১৯১ ৪১৮; শ্যামলী পরিবহনঃ ☎ ০৮৭১-৬১৪৯৮ (সুনামগঞ্জ), ০১৭১৪-৫৩৭ ৯১৬ (গাবতলী)। ঢাকা-সুনামগঞ্জ রুটে সরাসরি পরিবহণে ভাড়া হলোঃ এসি ৯০০/- এবং নন-এসি বাসে – ৫৫০/-।

রেলপথ

সুনামগঞ্জ আসার জন্য সরাসরি রেল যোগাযোগ নেই; রেল পথে কেবল মাত্র ছাতক আসার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) জংশন স্টেশন থেকে। তবে, ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন বা চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ট্রেনে সরাসরি সিলেট এসে সেখান থেকে সড়ক পথে সুনামগঞ্জ আসা যায়। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে প্রতিদিন একাধিক ট্রেন সিলেটের উদ্দেশ্যে ছাড়ে। ঢাকা-সিলেট এবং চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো হলোঃ

৭১০ পারাবত এক্সপ্রেস – সিলেট হতে দুপুর ০৩ টায় ছাড়ে এবং ঢাকায় রাত ০৯ টা ৪৫ মিনিটে পৌছে (মঙ্গলবার বন্ধ) ও ঢাকা থেকে ভোর ০৬ টা ৩৫ মিনিটে ছাড়ে এবং সিলেট পৌছে দুপুর ০১ টা ৪৫ মিনিটে (মঙ্গলবার বন্ধ);

৭১৮ জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস – সিলেট হতে সকাল ৮.৪০ মিনেটে ছাড়ে এবং ঢাকায় বিকাল ০৪ টায় পৌছে (বৃহস্পতিবার বন্ধ) ও ঢাকা থেকে দুপুর ১২ টায় ছাড়ে এবং সিলেট পৌছে ৭.৫০ মিনিটে (কোন বন্ধ নেই);

৭২০ পাহাড়ীকা এক্সপ্রেস (শনিবার বন্ধ) সিলেট হতে সকাল ১০ টা ১৫ মিনিটে ছাড়ে এবং চট্টগ্রামে রাত ০৭ টা ৪৫ মিনিটে পৌছে;

৭২৪ উদয়ন এক্সপ্রেস (রবিবার বন্ধ) সিলেট হতে রাত ০৭ টা ২০ মিনিটে ছাড়ে এবং চট্টগ্রামে ভোর ০৫ টা ৫০ মিনিটে পৌছে;

৭৪০ উপবন এক্সপ্রেস – সিলেট হতে রাত ১০ টায় ছাড়ে এবং ঢাকায় ভোর ০৫ টা ১০ মিনিটে পৌছে (কোন বন্ধ নেই) ও ঢাকা থেকে রাত ০৯ টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে এবং সিলেট পৌছে ভোর ৫.১০ মিনিটে (বুধবার বন্ধ);

৭৭৪ কালনী এক্সপ্রেস – সিলেট হতে সকাল ০৭ টায় ছাড়ে এবং ঢাকায় দুপুর ০১ টা ২৫ মিনিটে পৌছে (শুক্রবার বন্ধ) ও ঢাকা থেকে বিকাল ০৪ টায় ছাড়ে এবং সিলেট পৌছে রাত ১০ টা ৪৫ মিনিটে (শুক্রবার বন্ধ)।

ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেনঃ

কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন, ☎ ০২-৯৩৫৮৬৩৪,৮৩১৫৮৫৭, ৯৩৩১৮২২, মোবাইল নম্বর: ০১৭১১৬৯১৬১২

বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশন, ☎ ০২-৮৯২৪২৩৯ ওয়েবসাইট: www.railway.gov.bd

আকাশ পথে

সুনামগঞ্জ আসার জন্য সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই; ঢাকা থেকে সিলেটে সরাসরি বিমানে এসে সেখান থেকে সড়ক পথে সুনামগঞ্জে আসতে হয়। ঢাকা থেকে সিলেটে আসার জন্য বাংলাদেশ বিমান, জেট এয়ার, নোভো এয়ার, রিজেন্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়আর – প্রভৃতি বিমান সংস্থার বিমান পরিষেবা রয়েছে।

জল পথে

হাওড় বেষ্টিত জেলা হওয়া সত্ত্বেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে এ জেলার নৌ পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রচলন নেই বললেই চলে; কেবলমাত্র সিলেট ও হবিগঞ্জের কিছু এলাকা থেকে সরাসরি নৌ পথে আসা যায়।

অপরদিকে, হাওড় এলাকায় যোগাযোগের একমাত্র বাহন নৌযান। হাওর বেষ্টিত অঞ্চল বিধায় সুনামগঞ্জ আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌ পথ কেন্দ্রিক। এ জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ৬টি উপজেলা (ছাতক, জগন্নাথপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই, জামালগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর) থেকে জেলা সদরে সড়ক পথে যোগাযোগ রয়েছে। অবশিষ্ট ৪টি উপজেলার (বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও দোয়ারাবাজার) সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই; নৌ পথে চলাচল করতে হয়। আবার, সরাসরি সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ রাস্তাই কাঁচা বা অন্যান্য কারণে বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নৌ পথই একমাত্র অভ্যন্তরীন যোগাযোগের মাধ্যম।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!