থাইল্যান্ড: প্রাকৃতিক স্বর্গরাজ্য

স্ফটিক নীল জলের সৈকত, দুর্দান্ত খাবার, গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ু, আকর্ষণীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি পর্যটন বান্ধব পরিবেশের জন্য থাইল্যান্ড এশিয়ার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। বিখ্যাত সাদা হাতির দেশ নামেই দেশটি অতি সুপরিচিত।  থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের প্রাণকেন্দ্র যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের পরেই অবস্থিত।

 

থাইল্যান্ড ভ্রমনের জন্য জনপ্রিয় ৭টি স্থানের নাম

১. ব্যাংকক (Bangkok)

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কথা কে না জানে। তবে এই ব্যাংককের মতো দুর্লভ দর্শনীয় স্থান কম ই আছে তাই বা কয়জন জানে। তাই নিজে জানতে ঘুরে আসুন ব্যাংকক। আকাশচুম্বী টাওয়ার, আধুনিক স্থাপত্য, মন মাতানো চিত্র প্রদর্শনীয় গ্যালারির পাশাপাশি বিভিন্ন জাদুঘর তো থাকছেই। মনে করিয়ে দিই, ভাসমান বাজার এবং শপিং এর জন্য কিন্তু বিখ্যাত এই শহর। বি টি এস স্কাই ট্রেন বা এম আর টি পাতাল ট্রেন ভ্রমণ ও করে নিতে পারেন ব্যাংকক ভ্রমণ কালীন। তাছাড়া এখানে পাবেন প্রচুর স্ট্রিট ফুডের ছড়াছড়ি। মুখ রোচক এসব খাবারও আপনার ভ্রমণ স্মৃতিকে আরো সুন্দর করবে।

 

২. ফুকেট (Phuket)

ফুকেট হলো এ দেশের সব থেকে বৃহত্তম দ্বীপ। এই দ্বীপে সবার আনাগোণার মূল উদ্দেশ্যই হলো ফূর্তি করা। রাতভর বীচ জুড়ে চলে বিচিত্র সব বিনোদন। আর মৌসুমী বায়ুর স্থান বলে এই জায়গা আরো জনপ্রিয় ও আরামদায়ক। জেট স্কিটেইং, হাইকিং, ফিশিং ইত্যাদির জন্য এই জায়গা হতে পারে আপনার জন্য সব থেকে পছন্দের স্থান। এখানে আরো দেখতে পারবেন বিশ্ববিখ্যাত রেস্টলিং, যা দেখতে আপনাকে যেতে হবে মুয়া ফাইট ক্লাবে। ফুকেট ট্রিক আই মিউজিয়ামে গিয়ে হাস্যকর ছবি তুলতে ভুলে যাবেন না অবশ্যই। আর বিশ্বের প্রায় সব রকমের রেস্তোরাঁ , বার, ক্লাব পেতে পারেন ফুকেটে। তাই ফুকেট ভ্রমণ অবশ্যই ভোলা যাবে না।

 

৩. আয়ুথায়া (Ayutthaya)

সব থেকে পুরনো শহর এটি এদেশের। এখানে গেলে দেখতে পারবেন সারি সারি বৌদ্ধ মন্দির। পুরাকীর্তির প্রতি আকর্ষণ যাদের বেশি তাদের জন্য এই জায়গা আবশ্যিক ভ্রমণের। ব্যাংককের কাছেই এটি। তবে এই জায়গা ঘোরার জন্য সাইকেল ভাড়া করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এই শহরটি ইউনেস্কো আওতাভুক্ত। বুঝতেই পারছেন এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। সায়ামের স্বর্ণ যুগের কথা নিশ্চয়ই স্মরণ আছে? এই শহর ভ্রমণ আপনাকে ঠিক সে যুগেই নিয়ে যাবে।

 

৪. ক্র্যাবি (Krabi)

ক্র্যাবি হলো থাইওল্যান্ডের মূল ভূখন্ড দেখার একটি জায়গা, পাশাপাশি এখানে দ্বীপ ও পাবেন। থাইল্যান্ডের সব থেকে সুন্দর দ্বীপের নাম “ কোহ ফি ফি “। এর পাশে ম্যানগ্রোভ বন পাবেন। পশু প্রেমী যদি হয়ে থাকেন, তাহলে বলতে হয় এই জায়গা আপনার জন্যেই। ক্র্যাবি ঘুরতে এসে “ মায়া বে” পয়েন্ট ঘুরতে অবশ্যই ভুলবেন না। বুঝতেই পারবেন এ দ্বীপ কে কেন বলা হয় সৌন্দর্যের আঁধার।

 

 

৫. কাঞ্চনা বুরি (Kanchanaburi)

কাঞ্চনা বুরি অবস্থিত থাইল্যান্ডের পশ্চিমে। থাইল্যান্ডের যুদ্ধ নিয়ে ঐতিহাসিক সুন্দর এই জায়গা টি। এখানে আছে কুয়াই নদী। যার উপর দাঁড়িয়ে এখানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন হাজার হাজার পর্যটক। এখানে আছে ডেথ রেলওয়ে। এই রেলওয়ে নির্মাণের পেছনে যে সুদীর্ঘ রহস্যময় ইতিহাস লুকিয়ে আছে তা জানতেই আপনাকে ভ্রমণ করতে হবে এখানে। প্রা থাট নামের একটি গুহা এখানে পাবেন। এই গুহা কে শান্তির স্থান বলে আখ্যায়িত করা হয়। জনমানব থেকে দূরে এসে মেই খামিন নামক একটি জলপ্রপাত উপভোগ করতে পারেন এখানে। যুদ্ধকালীন কবরস্থান পাবেন এখানে। বিশাল বিশাল মন্দির আর ন্যাশনাল পার্কের সমারোহ এই জায়গায়। থাইল্যান্ডের ভেতরেই এ যেন এক ভিন্ন জায়গা।

 

৬. কোহ ফাঙ্গান (Koh Phangan)

মুন লিট নাইটে ফূর্তির জন্য এই জায়গা বেশ জনপ্রিয়। মূলত পার্টি প্রেমীদের জন্য এই জায়গা টা। হাদ রিন নামক এখানের একটি জায়গা আছে যা পার্টি করার জন্য বেশ বিখ্যাত। ছড়ান ছিটান ছোট ছোট দ্বীপ, সেখানে গেলে রাতকালীন বাজার পাবেন বিভিন্ন রকমের। খুব সুস্বাদু খাবার পাবেন খুব ই সুলভ মূল্যে। আপনার যদি হাতে সময় থাকে বেড়িয়ে আসতে পারেন বিভিন্ন থাই রান্নার সেন্টার থেকে। থাই সকল রান্না এখানেই শেখান হয় বেশি। তাছাড়া ইয়োগা সেন্টার গুলো ও পাবেন এখানে। কিছু সময় সেখানে থেকে পেয়ে যেতে পারেন মানসিক প্রশান্তি।

 

৭. পাতায়া (Pattaya)

থাইল্যান্ডে গেলে কিছু জায়গা যেগুলোর কথা মনে করিয়ে দিতে হয় না তার মধ্যে পাতায়া অন্যতম। পাতায় অবশ্য হানিমুনের জন্যেও বিখ্যাত। তবে নারী সান্নিধ্য ও মদ্যপানের এভেইলেবিলিটী থাকায় এই জায়গা কে অনেকে পাপের শহর বলে থাকেন। তাই অনেকেই এখানে প্রাপ্ত বয়স্ক ছাড়া ভ্রমণে নিষেধ করে থাকেন। তবে এসবের পাশাপাশিও আছে দেখার মতো বেশ কিছু জায়গা। দন্যান্য সী বীচ গুলোর মতো অতো সুন্দর না হলেও পাতায়ার সূর্যাস্ত আপনার মন কেড়ে নেবে। স্নোরকেলিং এর জন্য কাছেই আছে ভিন্ন এক সী বীচ। কাঠের তৈরি ‘’ স্যাংকচুয়ান অফ দ্য ট্রুথ “ মূর্তি গুলো বেশ আকর্ষণীয়। এখানে আসলে অবশ্য নুচ বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখতে ভুলবেনন না। নানারকম মূর্তি, ফুলের বাগান ও ফোয়ারা সমৃদ্ধ এই জায়গা ভ্রমণ আপনাকে বিশেষভাবে অভিভূত করবে।

 

থাইল্যান্ড ভ্রমণ করার কিছু টিপস

শুধু উপমহাদেশেই নয় সমস্ত পৃথিবী থেকে থাইল্যান্ডে বেড়াতে আসেন অসংখ্য পর্যটক, দর্শনার্থী। প্রাকৃতিক রূপ লাবণ্যে ভরা থাইল্যান্ডে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যা আগত দর্শনার্থীদের ব্যাপক আনন্দ দেয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতকালের তিনটি ঋতুতে সারা বছর পার হয়ে যায়। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ দেশের সমুদ্রসৈকত, ভূদৃশ্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ থাইল্যান্ড বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। যারা থাইল্যান্ড ভ্রমণ করার প্ল্যান করেছেন তাদের জন্য কিছু টিপস :

১।  জার্নি শুরু করার ২/১ দিন আগেই বাংলাদেশ থেকে অল্প কিছু থাই বাত নিয়ে নিবেন! এয়ারপোর্ট থেকে ডলার না ভাঙিয়ে বাইরে ভাঙালে দাম বেশি পাওয়া যায়। এয়ারপোর্টের স্ক্রিনে আপনার ফ্লাইট টাইম বারবার ভালো করে চেক করে নিন! আর ইমিগ্রেশন ফেইস করার সময় অবশ্যই কনফিডেন্ট থাকবেন।

২। আপনার ফোনের প্লে স্টোর কিংবা এপল স্টোর থেকে Wifi Master Key নামের একটা এপ্স আছে সেটা ইন্সটল করে নিন, অনেক সময় এয়ারপোর্টে সরাসরি WiFi কাজ করে না তাই ফোনে সিম না থাকলেও এটা দিয়ে Internet কানেক্ট করতে পারবেন।

৩। যদি টিকেটের কোন অফার না থাকে তাহলে BKK এয়ারপোর্ট হয়ে না গিয়ে ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। এতে ফ্লাইট ফেয়ার কমে পাবেন।

৪। এয়ারপোর্টে নেমে এয়ারপোর্ট স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ঠিক করবেন না। তাহলে, নির্ঘাত ধরা খাবেন। আগে থেকেই আপনার ফোনে ‘Grab’ এপটি ইন্সটল করে নিন। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে সব জায়গায় ‘Grab’ ইউজ করুন। গাড়ি ভাড়া নিঃসন্দেহে অনেক সেইভ করতে পারবেন। যারা আমার মতো সলো ট্রাভেলার তারা রেটিং দেখে তারপর হোটেল বুক করবেন! রেটিং ৮ দশমিক ৫ এর নিচে হলে সেই হোটেল বুক না করাই উত্তম! রেটিং এর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক স্ন্যাক্স সুবিধা আর ২৪/৭ রিসেপশন ওপেন থাকা হোটেল হলে আরও ভালো। যদিও হোস্টেলে কেও সারাক্ষণ খাওয়ার খাবার জন্য থাকেনা, তবুও একটা ফেসিলিটিজ থাকলে ভালো!

৫। যারা ব্যাংককে গ্র্যান্ড প্যালেস দেখতে যাবেন বলে প্ল্যান করেছেন তাদের বলবো ৫০০ বাত খরচ করে সেটা দেখার কোন মানে নাই! তার চেয়ে বেটার ১০০ বাত দিয়ে তার পাশেই ‘ওয়াট পো, গোল্ডেন মাউন্টেইন, ওয়াট অরুণ টেম্পল, ওয়াট সুতাত টেম্পল ঘুরে আসতে পারেন। তবুও কারো খরচ করতে ইচ্ছে হলে ঘুরে আসতে পারেন গ্র্যান্ড প্যালেস! ব্যাংকক আড্ডার জায়গা, এনজয়মেন্টের জায়গা! ব্যাংককের যেখানে যাবেন আপনার ভালো লাগবে! তবে, আমি ‘খাও সান রোড়ের’ প্রেমে পড়েছি! হাজার হাজার বাত খরচ করে ডিস্কোতে না গিয়ে এই একটা জায়গায় গেলে সারা রাত অনায়াসে আনন্দে, মজায়, লাফালাফি করে কাটিয়ে দেয়া যায়! তবে, যেতে হবে রাতে, ১১টা কিংবা ১২টার দিকে।

৬। অনেকে না বুঝে ফ্লোটিং মার্কেট যান! ফ্লোটিং মার্কেট করে মুখে ফেনা বের করে ফেলে! আসলে ফ্লোটিং মার্কেট আহামরি তেমন কিছুই না! পুরা ব্যাংককে অনেকগুলো ফ্লোটিং মার্কেট আছে, যদি একান্তই দেখতে ইচ্ছে হয় তাহলে আপনার কাছাকাছি যেটা আছে সেটাতে গিয়ে ঘুরে আসুন।

৭।বারের জন্য ব্যাংকক সেরার সেরা! স্পেশালি স্ট্রিট ফুড এবং ফ্রুটস এর জন্য! স্যাপ, ব্যাঙ, বিচ্ছু থেকে শুরু করে কত হাজার রকমের যে খাবার আছে তার নাই পরিসীমা! ও হ্যাঁ ব্যাংককের ডাব টা খেতে ভুলবেন না! আমার কাছে ব্যাংককে ঘুরাঘুরির চেয়ে খাবারগুলো বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে! যত পারেন খাবারের টেস্ট নেয়ার চেষ্টা করবেন তাহলে ট্রিপটা আরো বেশি স্মৃতিময় হয়ে থাকবে!

৮। আগেই বলেছি ঘুরাঘুরির জন্য গ্র্যাব ইউজ করবেন! তবে, ব্যাংককে প্রচুর টুকটুক আছে! যদি একান্তই টুকটুকে উঠতে হয় তাহলে ভালো করে দামাদামি করে উঠবেন আর গুগল ম্যাপ অবশ্যই চালু রাখবেন! টুকটুক ওয়ালারা এক জায়গার কথা বলে আরেক জায়গায় নামিয়ে দেয়! আর ভুলেও তাদের রিকমেন্ড করা কোন ট্যুর প্যাকেজ কিংবা এমিউজমেন্ট প্যাকেজ কিনবেননা, তাহলে সেই লেভেলের ধরা খাবেন।

৯। ব্যাংককের রিভার ক্রুজটা কারোই মিস করা উচিত না! সাথে থাই বিখ্যাত খাবার পাডতাই! এই পাডতাই এর জন্য মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে! যত পারেন হাঁটার চেষ্টা করবেন তাহলে অনেক কিছুই চোখে পড়বে তখন। ফ্লোটিং মার্কেটের নদী হয়ে ছোট্ট ডিঙি নৌকা করে ঘুরার একটা প্যাকেজ আছে প্রতিজন ১৫০/২০০ বাত নিবে! একদম ছোট্ট নদীর গা ঘেঁষে কোলাহল মুক্ত শহর ছেড়ে গহীন এক জঙ্গলে ঢুকে পড়ছে আপনার নৌকা, ব্যাপারটা আসলেই অন্য রকম অনুভূতির!

১০। শপিং এর জন্য ব্যাংককে শপিং মলের অভাব নেই! এমবিকে, রবিনসন, টার্মিনাল টুয়েন্টি ওয়ান, সিয়াম ডিসকভারি সহ আরো অনেক! তবে যারা কম বাজেটে শপিং করতে চান তাদের জন্য চাতুচাক উইকেন্ড মার্কেট বেস্ট!