পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ

Back to Posts

পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ

সৌন্দর্য, বিশালতা আর দুর্গমতা নিয়ে পর্বতশৃঙ্গ সমূহ দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। সাক্ষ্য বহন করে চলছে পৃথিবী গঠনের। বর্তমানে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে পাহাড় জয়ীদের কাছে। চূড়া জয় হয়ে উঠেছে ট্রেকারদের কাছে স্বপ্ন ও নেশা। তো- উচ্চতায় সর্বোচ্চ ও বেশ ভয়ঙ্কর কয়েকটি পাহাড়ের বিষয়ে জানা যাক। যাদের আবার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে ৮০০০ মিটার উঁচুতে। 

 

  1. Mount Everest (এভারেস্ট)

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালার নাম মাউন্ট এভারেস্ট আমরা সবাই জানি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৮৪৮ মিটার (২৯,০২৯ ফুট) উচ্চতায় এ দৈত্যাকার পর্বতমালার অবস্থান। এটি স্যাগারমথ জোন, নেপাল ও তিব্বত এবং চীন সীমান্তে অবস্থিত হিমালয় পর্বত মালার প্রধান অংশ। এর মনকাড়া সৌন্দর্য যে কারোই মন কাড়তে বাধ্য। হিমালয়ের বিশালতাই সবাইকে এর দিকে আকৃষ্ট করে। তাই তো প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক হিমালয়ের পাদদেশে ভিড় করে এর সৌন্দর্য উপভোগ এর জন্য। আর দুঃসাহসীরা পাড়ি জমায় হিমালয়ের চূড়ার দিকে। মাউন্ট এভারেস্টে ২৯ মে, ১৯৫৩ সালে প্রথম আরোহণ করেন এডমন্ড ও তেনজিং নোরগে। ব্রিটিশ পর্বতারোহীরা সর্বপ্রথম এই পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন। নেপালে এ সময় বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় ব্রিটিশরা তিব্বতের দিক থেকে এই পর্বতের উত্তর শৈলশীলা ধরে বেশ কয়েকবার আরোহণের চেষ্টা করেন। ১৯২২ সালে তারা এই পথে ৮,৩২০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ওঠে মানব ইতিহাসে নতুন কীর্তি স্থাপন করেন। প্রায় সব পর্বতারোহীরাই মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখেন। এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পর্বতারোহী মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন। বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত ৫ জন এভারেস্ট চূড়ায় আরোহন করেন। কখনও কখনও এই মাউন্ট এভারেস্ট পর্বত ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এতে প্রচুর পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন।

  1. K2  (কে-টু)

কে টু- পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এই পর্বতের উচ্চতা ৮,৬১১ মিটার বা ২৪,২৫১ ফুট। এটি হিমালয় পর্বতমালার কারাকোরাম পর্বত রেঞ্জের অন্তর্গত পর্বতশৃঙ্গটি পাকিস্তানের গিলগিত-বালতিস্তান ও চীনের জিংজিয়ানের তাক্সকোরগান সীমান্তে অবস্থিত। K2 পাকিস্তানের মাঝে সর্বোচ্চ পাহাড় বলে পরিচিত। এই পর্বতে প্রথম আরোহণ করা হয় ৩১ জুলাই, ১৯৫৪ সালে। পর্বতারোহীদের জন্য এটাতে আরোহণ করা কৌশলগত দিক দিয়ে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করা হয়। এই পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এটি ‘জংলি পর্বত’ নামেও পরিচিত। এতে ওঠার অনেক সহজ পথ থাকলেও সবচেয়ে সহজ রুটেও অনেক চড়াই উত্রাই পার হতে হয়। ভারি তুষারপাত, অধিক পরিমাণ শিলা ও বেশকিছু বরফ স্তম্ভ অতিক্রম করে যেতে হয়। যার ফলে কোনো ধরনের পূর্বাভাস ছাড়াই এই পর্বত ধসে পড়তে পারে। এর চূড়ায় আরোহণকারী প্রতি ৪ জনের মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। একারণেই এটি অন্যতম ভয়ঙ্কর পর্বত হিসেবে পরিচিত।

  1. Kangchenjunga  (কাঞ্চনজঙ্ঘা)

কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। এর উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার (২৪,১৬৯ ফুট)। এই পর্বতটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘা শব্দটি শুনে তত্সম শব্দ মনে হলেও অনেকের ধারণা এটি স্থানীয় শব্দ ‘কাং চেং জেং গা’, যার অর্থ ‘তুষারের পাঁচ ধনদৌলত’। অনেক ধর্মলম্বীদের কাছে এই পাহাড়টি পবিত্র একটি জায়গা। ভোরের আলো যখন কাঞ্চনজংগার চুড়ায় এসে পড়ে তখন মনে হয় কেঊ বুঝি ওর সৌন্দর্যে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে! আর শত শত মাইল দূর থেকেও সেই আলোর আভা দেখা যায়। আমাদের বাংলাদেশের পঞ্চগড় থেকেও মাঝে মাঝে কাঞ্চনজংগার চূড়ার দৃশ্য দেখা যায়। আর এর সৌন্দর্য সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।  যদি পৃথিবীর অন্যান্য পর্বতগুলোর মধ্যে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হার হিসেব করা হয়, তবে দেখা যাবে সবগুলোতেই এই হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো কাঞ্চনজঙ্ঘা। সাম্প্রতিককালের এক হিসেব মতে, এই পর্বতে মৃত্যুর হার বেড়েছে ২২ শতাংশ। প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ বেশকিছু কারণে পর্বতারোহীদের জন্য এই পর্বতে আরোহণ করা বেশ কঠিন। তাই পৃথিবীর অন্যান্য ভয়ঙ্কর পর্বতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

  1. Lhotse (লোৎসে)

এভারেস্টের সাথে সংযুক্ত এলহোটসে পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ পাহাড় । এলহোটসে নামের অর্থ হচ্ছে দক্ষিনের চূড়া। এভারেস্টের দক্ষিনে এর অবস্থান হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে এলহোটসে। এলহোটসের সুউচ্চ শৃঙ্ঘটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৫১৬ মিটার (২৭,৯৪০ ফিট) উঁচুতে অবস্থিত। এটি তিব্বত (চীন) এবং নেপালের খাম্বু অঞ্চলের সীমান্তে অবস্থিত।

  1. Makalu (মাকালু)

নেপাল ও চীনের মধ্যকার সীমান্তে দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে মাকালুর অবস্থান। এর ৮,৪১৮ মিটার (২৭,৮২৫ ফুট) উচ্চতা একে পৃথিবীর পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর মাঝে একটি হতে সাহায্য করেছে।  মাকালু পাহাড়টির আকৃতি অনেকটা পিরামিড এর মতো দেখতে। মাকালুর চারপাশের চারটি খাঁড়া কোণা একে দেখতে আরো আকর্ষণীয় করেছে। ১৯৫৪ সালে রাইলি কিগান নামে এক পর্বত আরোহীর নেতৃত্বে আমেরিকান একদল প্রথম মাকালু তে আরোহণ করেন। আরোহণের জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পর্বত গুলোর মধ্য একটি  বলে মাউন্টেইনারদের কাছে বিবেচিত। গত বছর ভারতীয় অভিজ্ঞ মাউন্টেনিয়ার দিপঙ্কর ঘোষ মাকালু সৃঙ্গের চুড়া আরোহণ করে ফেরার সময় চিরতরে হারিয়ে যান।

 

  1. Cho Oyu (চো ওইয়ু)

পৃথিবীর ৬ষ্ঠ সর্বোচ্চ পর্বত চো ওয়ূ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,২০১ মিটার (২৬,৯০৬ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। মাউন্ট এভারেস্ট থেকে ২০ কিমি. পশ্চিমে মহালাঙ্গুর হিমালয় এর Khumbu উপবিভাগের পশ্চিমতম অঞ্চলকে এর সর্বোচ্চ শিখর ধরা হয়।

  1. Dhaulagiri (ধবলগিরি)

প্রায় ২৬,৭৯৫ ফুট (৮,১৬৭ মিটার) লম্বার এই পর্বত পৃথিবীর সপ্তম উঁচু পাহাড়। নেপালের উত্তরে এর অবস্থান। একে শ্বেত পাহাড় নামেও ডাকা হয়, কারণ ১২ মাসেই এটি শ্বেত বরফে ঢাকা থাকে । দৌলগিরির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চল উভয়ই বিশাল খাঁদ বিশিষ্ট্য; প্রতিটি খাঁদ তার ভিতর থেকে ৮০০০ মিটার উপরে বৃদ্ধি পেয়ে আবার নীচে নেমে গিয়ছে যা এর ভয়ংকর রূপ কে আরো দৃঢ় করেছে। মজার ব্যপার হলো প্রায় ৩০ বছর যাবত মানুষ এটিকেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে জানতো! পরে এই ভুল ভাঙে।

  1. Manaslu (মানাসলু)

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ ‘মানাসলু’ অবস্থিত। এটি পৃথিবীর অষ্টম সর্বোচ্চ চূড়া। উচ্চতা ৮ হাজার ১৬৩ মিটার (২৬ হাজার ৭৮০ ফুট) উঁচু এবং পৃথিবীর চতুর্থ বিপদজনক শৃঙ্গ। ১৯৫৬র ৯ই জুন তোশিও ইমিশিনি এবং গিয়ালজেন নরবু নামে ২ জাপানি ভদ্রলোক প্রথম মানাসলুর বুকে আরোহণ করেন। এই শৃঙ্গে অভিযানকালে এ পর্যন্ত ৪৫০ পর্বতারোহী বিজয়ী ও ৮০ জন মারা গেছে। 

  1. Nanga Parbat (নাঙ্গা পর্বত)

নাঙ্গা পর্বত পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোর মধ্যে নবম স্থানে অবস্থান করছে। উচ্চতা প্রায় ২৬.৬৬০ ফুট (৮,২৬৬ মিটার)! এটি পাকিস্তানের উচ্চতম পর্বত। ৩ জুলাই, ১৯৫৩ সালে সর্বপ্রথম একদল আস্ট্রিয়ান ও জার্মান অভিযাত্রী এর শীর্ষে আরোহণ করেন। পর্বতারোহীদের নিকট নাঙ্গা পর্বতে আরোহণ অত্যন্ত কঠিন। ‘কে টু’ পর্বতের মতো এটিও ‘টেকনিক্যালি ডিফিকাল্ট’ হিসেবে পরিচিত। এই পর্বতের শিখরে পৌঁছানোর প্রথম পদক্ষেপেই যে কাউকেই অতিক্রম করতে হবে খুবই সরুপথ। এটি অতিক্রম করতে ১৫,০০০ ফুট ওপরে আরোহণ করতে হয়। এই সকল ভয়ানক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই পর্বত খুবই ভয়ঙ্কর। এই পর্বতে আরোহণ করতে গিয়ে অনেক পর্বতারোহী মৃত্যুবরণ করেছেন। এ কারণে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘দ্য ম্যান ইটার’ বা ‘মানব খাদক’ পর্বত হিসেবে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের দিকে এটি “কিলার মাউন্টেন” নামে পরিচিত ছিল। অনেকে এই পর্বতকে উর্দুতে উলঙ্গ পর্বত নামেই ডাকা হয়! আর মজার ব্যপার হলো যদিও এই পাহাড় টি পাকিস্তানের এটি গিল্গিত-বালতিস্তান অঞ্চলের ডাইমিরেতে অবস্থিত কিন্তু আপনি যদি এর চূড়ায় উঠতে পারেন তখন কিন্তু আপনি পাকিস্তানের সীমানার বাহিরে!

  1. Annapurna( অন্নপূর্ণা )

উচ্চতার দিক দিয়ে পৃথিবীতে অন্নপূর্ণা পর্বতের অবস্থান দশম স্থানে। এর আনুমানিক উচ্চতা ২৬,৫৪৫ ফিট ৮,০৯১ মিটার। এই পর্বতে প্রথম আরোহণ করা হয় ৩ জুন, ১৯৫০ সালে। বরফ বেয়ে ওঠাই এই পর্বত আরোহণের সহজ পথ। নেপালের হিমালয় পর্বত মালার উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অন্নপূর্ণার অবস্থান। হিমালয়ের বিস্তৃত পর্বত মালার মাঝে উত্তরাঞ্চল এর সর্বোচ্চ চূড়াকেই অন্নাপূর্ণা নামে ডাকা হয়। সর্বপ্রথম ‘মরিস হার্জগ’ এবং ‘লুইস লাচেনাল’ ১৯৫০ সালে এর সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেন। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১৩০ জনেরও বেশি পর্বতারোহী এটি আরোহণ করেছেন এবং ৫৩ জন উঠতে গিয়ে মারা গেছেন। এই সংখ্যাই বুঝিয়ে দেয় অন্নপূর্ণা কতটা ভয়াল। তবে এর সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গা হচ্ছে ৮,০০০ মিটার উঁচুতে। 

11. ব্রড পিক (broad peak) 

ব্রড পিক উচ্চতার দিক দিয়ে পাকিস্তানে ৪র্থ এবং পৃথিবীতে ১২তম। ব্রড পিক গাশারব্রুম স্তুপ-পর্বতের অংশ এবং কে২ থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।পাকিস্তানের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছে এটি অবস্থিত। জুন ৯, ১৯৫৭ একদল অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী সর্বপ্রথম এর শীর্ষে আরোহণ করেন। এর সর্বোচ্চ উচ্চতা ৮, ০৫১ মিটার ।


প্রথম আরোহন: ৯ জুন, ১৯৫৭
লোকেশন: গিলগিট-বালুচিস্তান, পাকিস্তান; শিনচিয়াং, গণচীন
পর্বতমালা: হিমালয় পর্বতমালা, কারাকোরাম, Baltoro Muztag
প্রথম আরোহনকারী: Hermann Buhl, Kurt Diemberger, Fritz Wintersteller, Marcus Schmuck.

 

 

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Posts
error: Content is protected !!